ইতালিতে ৩২ লাখ টাকায় ভুয়া কাজের ভিসা বাণিজ্য: টেলিভিশনের অনুসন্ধানে পালেরমোর বাংলাদেশি ‘কাফ’ পরিচালকের নাম

4 Min Read

ইতালির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ‘রাই থ্রি’র অনুসন্ধানে ভুয়া চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে চড়া মূল্যে লোক আনার অভিযোগ উঠেছে; অভিযুক্ত আল আমিনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা এবং শ্যালকের স্বীকারোক্তিতে প্রবাসী সমাজে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

ইতালিতে বাংলাদেশিদের ভুয়া চাকরির প্রস্তাব দেখিয়ে প্রায় ৩২ লাখ টাকা (আনুমানিক ২০ হাজার ইউরো) হাতিয়ে নেওয়ার এক বিশাল চক্রের সন্ধান পেয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল ‘রাই থ্রি’ (Rai 3)। চ্যানেলটির জনপ্রিয় অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘মি মান্দা রাইত্রে’ (Mi Manda RaiTre)-তে প্রচারিত এক প্রতিবেদনে সিসিলি দ্বীপের রাজধানী পালেরমোতে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশি আল আমিনের বিরুদ্ধে এই অবৈধ ভিসা বাণিজ্যের অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কর ও প্রশাসনিক সহায়তা কেন্দ্র কাফ (CAF) এবং পারিবারিক মিনিমার্কেট ব্যবসার আড়ালে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ৭০ জন প্রবাসীকে ভুয়া নথিপত্রে ইতালিতে আনার অপতৎপরতা চালিয়েছে এই চক্র।

টেলিভিশনটির অনুসন্ধানী দল একজন ছদ্মবেশী ক্রেতার মাধ্যমে অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পারে, পালেরমোর একটি মিনিমার্কেটে আল আমিনের শ্যালক সরাসরি ভিসা বাণিজ্যের প্রস্তাব দিচ্ছেন। শ্যালকের দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে একজনকে ইতালির বৈধ রেসিডেন্স পারমিট বা ‘পেরমেসসো দি সোজ্জোর্নো’র (Permesso di soggiorno) অনুমোদনসহ আনতে সর্বনিম্ন ৩২ লাখ টাকা দিতে হয়। এই অর্থ পরিশোধ করলে মাত্র এক থেকে ছয় মাসের মধ্যেই ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, তিনি দাবি করেন যে কেবল ২০২৬ সালেই তাদের মধ্যস্থতায় প্রায় ৭০ জন বাংলাদেশিকে এই প্রক্রিয়ায় ইতালিতে নিয়ে আসা হয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভিসা অনুমোদনের জন্য কাগজে-কলমে ইতালীয় নিয়োগকর্তার ভুয়া চাকরির চুক্তিপত্র ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ভুক্তভোগীরা চড়া মূল্যে ভিসা কিনে দেশটিতে পৌঁছানোর পর দেখতে পান, বাস্তবে কোনো কাজের অস্তিত্ব নেই। ফলে অনেক প্রবাসী সর্বস্ব হারিয়ে ইতালিতে এসে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এবং কেউ কেউ বাধ্য হয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ছেন। প্রতারণার শিকার এক প্রবাসী জানান, আল আমিন ভিসা করিয়ে দিলেও কোনো কাজের ব্যবস্থা করেননি; দেশটিতে পৌঁছানোর পর সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বে কাজ খুঁজতে হয়েছে। অনুসন্ধানী দলের সামনে উপস্থিত হয়ে অন্য এক ভুক্তভোগী সরাসরি আল আমিনের কাছে তার প্রতিশ্রুত নিয়োগকর্তার বিষয়ে জবাবদিহি দাবি করেন।

টেলিভিশন দলের পক্ষ থেকে আল আমিনের মুখোমুখি হয়ে ৩২ লাখ টাকার বিনিময়ে মানুষ আনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, ভিসার জন্য এত টাকা নেওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয় এবং তার আত্মীয়দের এমন বক্তব্যের দায়ভার তিনি নেবেন না। তবে প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, আল আমিনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে স্থানীয় থানায় একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ বা ‘দেনুনচা’ (Denuncia) দায়ের করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ইতালিতে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আনার পর শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে।

ইতালিতে কাফ (CAF) কেন্দ্রগুলো মূলত সাধারণ মানুষের কর ও সরকারি প্রশাসনিক নথিপত্রে আইনি সহায়তা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে। অথচ অভিবাসীদের সেবাদানকারী এমন একটি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে ভিসা বাণিজ্যের অভিযোগ পুরো প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ইতালির স্পন্সর বা কাজের ভিসার নামে বিপুল অর্থ দাবি করা হলে কোনো মধ্যস্থতাকারীকে অর্থ দেওয়ার আগে নিয়োগকর্তার পরিচয়, কাজের চুক্তিপত্র এবং সরকারি অনুমোদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতারণা থেকে বাঁচতে যাবতীয় লেনদেনের ব্যাংকিং প্রমাণ সংরক্ষণ এবং সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের পরামর্শ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

ইতালির কাজের ভিসার নামে প্রায় ৩২ লাখ টাকা নেওয়া হলেও অভিযোগ, ভুয়া চাকরির প্রস্তাব দেখিয়ে বাংলাদেশিদের আনা হয়; পরে প্রকৃত চাকরি না পেয়ে অনেকে বিপাকে পড়েন।

Rai Tre

Share This Article