ইউরোপে অভিভাবকহীন অভিবাসী শিশুর সংখ্যা বাড়ছে: ইতালিতে পৌঁছানোদের বড় অংশই বাংলাদেশি, জাতিসংঘের গভীর উদ্বেগ

4 Min Read

ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপগামী শিশুদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই পাড়ি দিচ্ছে স্বজন ছাড়া; পাচারকারীদের হাতে সহিংসতা ও শোষণের শিকার হওয়া নিয়ে জরুরি সতর্কবার্তা দিল জাতিসংঘের তিন সংস্থা।

কোনো ধরনের অভিভাবক ছাড়াই জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে পৌঁছানো আশ্রয়প্রার্থী শিশুদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের এক যৌথ প্রতিবেদনে এই মানবিক সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তথ্যানুযায়ী, ইউরোপমুখী বিপজ্জনক পথ পাড়ি দেওয়া শিশুদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই পৌঁছাচ্ছে সম্পূর্ণ একা এবং তাদের সঙ্গে কোনো মা-বাবা বা আইনি অভিভাবক নেই। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানো অপ্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশই বাংলাদেশি কিশোর। দুর্গম অভিবাসন পথে তারা কীভাবে মানবপাচারকারীদের নির্মম শোষণ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা আইওএম (IOM), শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর (UNHCR) এবং আন্তর্জাতিক শিশু তহবিল ইউনিসেফ (UNICEF) এই তিন সংস্থার যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, বিভিন্ন অনিয়মিত রুটে ইউরোপে প্রবেশ করা মোট ৩১ হাজার ১০০ শিশুর মধ্যে ২০ হাজারের বেশি এসেছে অভিভাবক ছাড়া। পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ইউরোপের ছয়টি প্রধান প্রবেশদ্বার বুলগেরিয়া, সাইপ্রাস, গ্রিস, ইতালি, মাল্টা ও স্পেনে শিশুদের সামগ্রিক আগমন ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মোট আগতদের মধ্যে একা আসা শিশুর অনুপাত ৫১ শতাংশ থেকে একলাফে বেড়ে ৬৭ শতাংশে পৌঁছেছে। এদের মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে এবং বাকি ২২ শতাংশ মেয়ে শিশু।

প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, সীমান্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক আশ্রয় নিয়েছে ইতালিতে। দেশটিতে প্রবেশ করা ১৪ হাজারের বেশি শিশুর সিংহভাগই ছিল বাংলাদেশ এবং পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিক। অন্যদিকে গ্রিসে পৌঁছানো শিশুদের মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া ও আফগানিস্তানের নাগরিক বেশি ছিল। আর স্পেনে প্রবেশ করা অপ্রাপ্তবয়স্কদের বড় অংশ এসেছে মরক্কো, আলজেরিয়া ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো থেকে। ফলে ইতালিতে পৌঁছানো অভিভাবকহীন এই বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কিশোরের আইনি মর্যাদা, মানসিক সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক মহাসাগরীয় পথ এবং পশ্চিম বলকান রুটে যাতায়াতকারী ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৪ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি তরুণ ও কিশোরের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছে আইওএম। তাদের দেওয়া তথ্যে চরম মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া তরুণদের প্রায় অর্ধেকই জানিয়েছেন যে তারা পথে মারাত্মক শারীরিক সহিংসতার মুখে পড়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ও নির্মম নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে লিবিয়ার অভ্যন্তরে। অভিবাসীদের নিরাপদ ও বৈধ পথের সুযোগ কমে যাওয়ায় কিশোর-তরুণেরা বাধ্য হয়ে আরও বিপজ্জনক পথ বেছে নিচ্ছে এবং মানবপাচারকারী চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ছে।

এমন প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন ও আশ্রয় বিষয়ক নতুন চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো। তাদের মতে, এই আইনি কাঠামো রাষ্ট্রহীন ও অভিবাসী শিশুদের সুরক্ষা জোরদারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সংস্থাগুলো জোর দিয়ে বলেছে, যেকোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকেই সবার ওপরে স্থান দিতে হবে। আইওএমের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ মন্তব্য করেন, নিরাপদ বিকল্পের অভাব এবং পাচারকারীদের ওপর নির্ভরশীলতা শিশুদের চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে। শিশুদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা এবং তাদের প্রয়োজনীয় আইনি ও মানবিক সহায়তা দিতে জাতীয় সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা সবার যৌথ দায়িত্ব।


ইতালিতে পৌঁছানো ১৪ হাজারের বেশি অভিবাসী শিশুর বড় অংশ বাংলাদেশি; ইউরোপে অভিভাবকহীন শিশুর হার বেড়ে ৬৭ শতাংশে পৌঁছেছে, সতর্ক করেছে জাতিসংঘের তিন সংস্থা।

noticiasbangla

Share This Article