দেক্রেতো ফ্লুসি স্কিমে জনপ্রতি ১৮ থেকে ২৫ হাজার ইউরো দিয়েও ভুয়া কোম্পানির ফাঁদে পড়েছেন প্রবাসীরা; ইউনিয়ন সিজিআইএলের প্রতিবেদনে উঠে এল আধুনিক দাসত্বের চিত্র।
ইতালির সরকারি কর্মসংস্থান ভিসা বা ‘দেক্রেতো ফ্লুসি’র (Decreto Flussi) মাধ্যমে বৈধভাবে কাজের আশায় গিয়ে চরম প্রতারণার শিকার হয়েছেন প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি অভিবাসী। দেশে থাকা পরিবারের ভিটেমাটি ও জীবনের সব সঞ্চয় বিক্রি করে জনপ্রতি ১৮ থেকে ২৫ হাজার ইউরো (প্রায় ২৪ থেকে ৩৩ লাখ টাকা) দালালদের হাতে তুলে দিয়েও ইতালিতে এসে কোনো কাজের দেখা পাননি তারা। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় কাম্পানিয়া (Campania) অঞ্চলে গড়ে ওঠা এমন একটি বিশাল মানবপাচার ও ভিসা জালিয়াতি চক্রের তথ্য উন্মোচন করেছে ইতালির শীর্ষস্থানীয় ট্রেড ইউনিয়ন সিজিআইএল (CGIL)।
ট্রেড ইউনিয়নের প্রকাশিত বিশেষ এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, কাম্পানিয়ার ভিসুভিয়াস পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত পোজ্জিওমারিনো (Poggiomarino) ও তার পার্শ্ববর্তী পৌরসভাগুলোতে কাজ দেওয়ার কথা বলে এসব বাংলাদেশিকে ইতালি আনা হয়েছিল। তবে দেশটিতে পৌঁছানোর পর অভিবাসীরা দেখতে পান, যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে তাদের কাজের আবেদন করা হয়েছিল সেগুলোর বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। এই ‘কাগুজে বা ভুয়া কোম্পানিগুলোর’ (Società fantasma) কারণে তারা সরকারের নির্ধারিত বৈধ কর্মসংস্থান চুক্তি (Contratto di soggiorno) হাতে পাননি। ফলে আইনের চোখে অনিবন্ধিত হয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতায় পড়েছেন এসব অভিবাসী।

বৈধ কাগজপত্রবিহীন এই অসহায় প্রবাসীরা জীবনধারণের তাগিদে স্থানীয় অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগী বা ‘কাপোরালে’দের (Caporale) খপ্পরে পড়তে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিদিন ভোররাতে সড়কের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এসব কর্মীকে কৃষিকাজের জন্য ভাড়া করা হয়। খামারে দিনে হাড়ভাঙা খাটুনির পর ঘণ্টায় মাত্র ৬ ইউরো মজুরি দেওয়া হলেও সেখান থেকে আবার ৫০ সেন্ট কেটে নেয় দালাল চক্র। অন্যদিকে, স্থানীয় বস্ত্র কারখানায় কাজের সুযোগ পাওয়া শ্রমিকদের অবস্থা আরও করুণ। সেখানে দিনে ১২ ঘণ্টা সেলাই মেশিনের সামনে বসে কাজ করে ঘণ্টায় মিলছে মাত্র ২ ইউরো। এই নামমাত্র আয়ে টিকে থাকতে অভিবাসীরা দলবেঁধে পরিত্যক্ত গুদামঘর ও স্যাঁতসেঁতে অস্বাস্থ্যকর কামরায় গাদাগাদি করে রাত কাটাচ্ছেন।
শ্রমিকদের এই দুরবস্থার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ফ্লাই সিজিআইএল কাম্পানিয়ার সাধারণ সম্পাদক ইগোর প্রাতা (Igor Prata) বলেন, ভুয়া চুক্তির কারণে প্রবাসীরা সরাসরি অপরাধী চক্র ও দালালদের শোষণের শিকার হচ্ছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ইতালি আসা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই বিদেশি শ্রমিকদের অধিকার বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকছে না; অসাধু চক্রগুলোর কাছে তারা কেবলই বলির পাঁঠায় পরিণত হয়েছেন।
প্রতিবেদনটিতে কাম্পানিয়া অঞ্চলের সামগ্রিক কৃষি খাতের সংকটের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। সিজিআইএলের ‘প্লাচিদো রিজোত্তো’ পর্যবেক্ষণ সেলের তথ্য অনুযায়ী, পুরো কাম্পানিয়াতে প্রায় ৭০ হাজার কৃষি শ্রমিক কর্মরত, যাদের প্রায় অর্ধেকই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের বিভিন্ন দেশের নাগরিক। এর মধ্যে সর্বাধিক ২৮ হাজার শ্রমিক কাজ করেন সালের্নো প্রদেশে, যার ৩১ দশমিক ৭ শতাংশই অভিবাসী। অন্যদিকে কাসের্তা প্রদেশে ১৭ হাজারের বেশি এবং নাপোলিতে প্রায় ১৩ হাজার শ্রমিক কৃষিকাজের সাথে যুক্ত।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কাসের্তা ও নাপোলি এলাকার কৃষিশ্রমিকদের গড় আয় জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম। কাজের অনিয়মিততার কারণে বেশিরভাগ শ্রমিক বছরে ন্যূনতম ৫১ দিনের কাজও দেখাতে পারেন না, যার ফলে তারা রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে উন্নত কৃষিব্যবস্থার কারণে কেবল সালের্নোতে মজুরি জাতীয় গড়ের কিছুটা ওপরে রয়েছে। এমন বাস্তবতায় খামারে খামারে গিয়ে বিদেশি শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে এবং আইনি সহায়তা পৌঁছে দিতে কাম্পানিয়াজুড়ে ‘শ্রম ব্রিগেড’ (Brigate del Lavoro) নামে বিশেষ পথ ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম শুরু করেছে সংস্থাটি।
কাম্পানিয়ায় প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি ১৮–২৫ হাজার ইউরো দিয়ে ভুয়া কাজের চুক্তির প্রতারণার শিকার; পরে অনিয়মিত অবস্থায় কৃষি ও পোশাকশিল্পে অতি কম মজুরিতে শোষণের শিকার হচ্ছেন।
napoli.repubblica


