ইতালিতে কঠোর নিরাপত্তা ডিক্রি জারি: কিশোর অপরাধীদের বিচারে কড়াকড়ি, মিলানে সেনা মোতায়েন

4 Min Read

মিলানে সাম্প্রতিক সহিংসতা ও ব্যাপক ভাঙচুরের প্রেক্ষাপটে নতুন আইন অনুমোদন করেছে ইতালি সরকার; অপ্রাপ্তবয়স্কদের ফৌজদারি দায়বদ্ধতার পাশাপাশি অভিভাবকদের ক্ষতিপূরণ ও জরিমানার কঠোর বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

সম্প্রতি মিলানসহ কয়েকটি বড় শহরে সংঘটিত সহিংসতা, লুটপাট ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির প্রেক্ষাপটে দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ডিক্রি (Decreto Sicurezza) জারি করেছে ইতালি সরকার। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে অনুমোদিত এই নতুন আইনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধের দায়মুক্তি সীমিতকরণ, বিক্ষোভকালে সহিংসতায় জড়িতদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জেল-জরিমানা এবং মিলানের রাজপথে সেনাবাহিনী মোতায়েনের মতো একগুচ্ছ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশটিতে অপরাধ দমন, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ আইনি পরিবর্তন আসছে।

নতুন এই নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে। এখন থেকে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে বয়সের কারণে কোনো ধরনের ছাড় বা বিশেষ অনুকম্পা পাবে না। পূর্ববর্তী আইনে কৌঁসুলিদের প্রমাণ করতে হতো যে অভিযুক্ত কিশোরের অপরাধ করার মানসিক পরিপক্বতা ছিল কি না। কিন্তু পরিবর্তিত বিধানে এই বয়সের তরুণদের অপরাধ সংঘটনের পূর্ণ মানসিক সক্ষমতা রয়েছে বলেই গণ্য করা হবে। ফলে আসামিপক্ষ সুনির্দিষ্টভাবে মানসিক ভারসাম্যহীনতা প্রমাণ করতে না পারলে তাদের স্বাভাবিক অপরাধীদের মতোই বিচার করা হবে। একই সঙ্গে ‘যে ভাঙবে সে ক্ষতিপূরণ দেবে’ নীতির অধীনে কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক সরকারি কিংবা ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতি করলে তার সম্পূর্ণ আর্থিক দায়ভার অভিভাবকদের ওপর চাপানো হয়েছে। বাসস্ট্যান্ড বা ট্রাফিক সিগন্যালের মতো সরকারি সম্পদ নষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রেফেক্ট (প্রাদেশিক প্রধান) সরাসরি ক্ষতিপূরণের নোটিশ পাঠাবেন। এছাড়া ব্যক্তিগত দোকানের কাচ বা গাড়ি ভাঙচুরের শিকার ব্যক্তিরা বিচারকের মাধ্যমে দ্রুত ক্ষতিপূরণ আদায়ের আদেশ নিতে পারবেন। পাশাপাশি অপ্রাপ্তবয়স্কদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য বাবা-মাকে ৫০০ থেকে ১ হাজার ইউরো পর্যন্ত প্রশাসনিক জরিমানা গুণতে হবে, যা পুনরায় অপরাধের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হবে।

বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক সমাবেশের নামে বিশৃঙ্খলা দমনেও সর্বোচ্চ কঠোরতার বার্তা দিয়েছে প্রশাসন। নতুন আইনে ‘সমাবেশে সহিংস অংশগ্রহণ’ শিরোনামে একটি পৃথক অপরাধ যুক্ত করা হয়েছে। পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তি দলবদ্ধ হয়ে পাথর, লাঠিসোঁটা কিংবা বিপজ্জনক আতশবাজি ছুড়ে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করলে তাদের বিরুদ্ধে ২ থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ২০ হাজার ইউরো জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। মুখ ঢেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে কিংবা সহিংসতায় কেউ আহত হলে এই শাস্তির মাত্রা আরও বাড়বে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহিংস জমায়েতের উসকানি কিংবা পরিকল্পনা করলে ৪ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত জেলের মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের কাজের সুবিধার্থে ‘বিলম্বিত গ্রেপ্তার’ (Arresto differito) ব্যবস্থার আওতা বাড়ানো হয়েছে; অর্থাৎ, ঘটনার সময় তাৎক্ষণিক আটক না করা গেলেও পরবর্তীতে ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে নাশকতাকারীদের গ্রেপ্তার করা যাবে। ব্যাপক সংখ্যক গ্রেপ্তারের আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগের ঘোষণাও দিয়েছেন দেশটির বিচারমন্ত্রী কার্লো নর্দিও।

এদিকে মিলান শহরের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে নজরদারি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘নিরাপদ সড়ক’ (Strade Sicure) অভিযানের আওতায় অতিরিক্ত ৫০০ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অন্তত আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর এই সদস্যরা পুলিশ ও কারাবিনিয়ারির সঙ্গে সমন্বয় করে নগরীর বিভিন্ন স্থানে টহল দেবেন। তবে তাঁদের কোনো বিচারিক বা তদন্তকারী পুলিশের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি কোনো আনুষ্ঠানিক মিছিল বা প্রতিবাদ ছাড়াই শহরে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে পুলিশ কমিশনারের বিশেষ মৌখিক সতর্কবার্তা বা ‘প্রতিরোধমূলক নিষেধাজ্ঞা’ (Fermo preventivo)-এর পরিধি বাড়ানো হয়েছে। জনবহুল কোনো এলাকায় ভীতিকর বা সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করলে পুলিশ সন্দেহভাজনদের চলাফেরা বা জমায়েতে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারবে, যা এখন থেকে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের ওপরও কার্যকর করা যাবে।

ইতালির নতুন নিরাপত্তা ডিক্রিতে সহিংস বিক্ষোভে কঠোর শাস্তি, ১৪–১৮ বছর বয়সীদের দায়বদ্ধতা, এবং মিলানে ‘স্ট্রাদে সিকুরে’ অভিযানে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েনের বিধান করা হয়েছে।

roma.corriere

Share This Article