সেউটার অভিবাসী সংকটের জেরে শেনজেন চুক্তির সুবিধায় স্থবিরতা; ইতালীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ানতেদোসির সাক্ষাৎকারে উঠে এল নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ।
ইউরোপের শেনজেন এলাকার অবাধ চলাচল নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতালি ও স্পেনের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করেছে। স্প্যানিশ ছিটমহল সেউটাতে (Ceuta) চলমান অনিয়মিত অভিবাসী সংকটের প্রেক্ষাপটে দুই দেশই তাদের সীমান্তে কড়াকড়ি ও তল্লাশির মেয়াদ আরও ১৫ দিন বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত আগস্টের শুরুতে কার্যকর হওয়া এই বিশেষ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আপাতত শিথিলের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
ইতালির অবস্থান ও পিয়ানতেদোসির ব্যাখ্যা
সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইতালীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ানতেদোসি এই পরিস্থিতির গভীরতা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাসকার সাথে টেলিফোনে আলাপের পর ইতালি তাদের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের মেয়াদ আরও ১৫ দিন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। পিয়ানতেদোসি এই সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত দাবি করে বলেন, “এটি কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ‘সীমান্ত নিরাপত্তা বিশ্লেষণ কমিটি’র (Comitato di analisi della sicurezza delle frontiere) বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপ।”
মন্ত্রীর মতে, সেউটাতে এখনো ৫ থেকে ১০ হাজার অভিবাসী অবস্থান করছেন, যা ইতালির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তবে তিনি এও উল্লেখ করেন যে, অভিবাসী সংকট মোকাবিলায় স্পেন সরকার ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে ইতালি ইতিবাচকভাবে দেখছে। সে কারণেই কড়াকড়ির মেয়াদ দীর্ঘ না করে আপাতত ১৫ দিন রাখা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতির উন্নতি হলে এটিই হতে পারে শেষ দফার মেয়াদ বৃদ্ধি।
স্পেনের পাল্টা ব্যবস্থা ও ফেক নিউজের অভিযোগ
ইতালির এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় স্পেনও ‘পারস্পরিকতা’ বা ইটের বদলে পাটকেল নীতি গ্রহণ করেছে। মাদ্রিদ ঘোষণা করেছে যে, ইতালি থেকে আগত যাত্রীদের ওপর তাদের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও আগামী দুই সপ্তাহ কার্যকর থাকবে। এদিকে, স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সেউটার এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির জন্য বিদেশি অপশক্তিকে দায়ী করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, রুশ ও ইসরায়েলি কিছু নেটওয়ার্ক পরিকল্পিতভাবে ‘ভুয়া খবর’ বা ‘ফেক নিউজ’ ছড়িয়ে অভিবাসীদের উসকে দিচ্ছে। তাদের দাবি ছিল, সমুদ্র সাতরে সেউটাতে প্রবেশ করলে কাউকে ফেরত পাঠানো হবে না, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সানচেজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ প্রবেশের চেষ্টা করেছিল, যাদের মধ্যে ৯০ শতাংশকেই মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ৫ হাজার অভিবাসী রয়েছে, যাদের মধ্যে ১৫০০ জনই সঙ্গীহীন নাবালক।

পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের চিত্র
গত এক মাসে ইতালীয় পুলিশ ও সীমান্ত রক্ষা বাহিনী ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫ লক্ষ যাত্রীর তথ্য যাচাই করা হয়েছে এবং স্পেন থেকে আসা ১ লক্ষ ৮০ হাজার মানুষের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ৩১ জনকে ইতালিতে প্রবেশে বাধা দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং ৬ জনকে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন সেউটা থেকে এসেছেন, তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের ভূমিকা
ব্রাসেলস থেকে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ইতালির নেওয়া এই পদক্ষেপের যৌক্তিকতা এবং এটি শেনজেন আইনের সাথে সংগতিপূর্ণ কি না, তা খতিয়ে দেখছে ইউরোপীয় কমিশন। যদিও ইতালির মেলোনি সরকারের এই পদক্ষেপে কমিশন এখনো কোনো কঠোর আইনি ব্যবস্থা বা ‘ইনফ্রাকশন প্রসিডিউর’ শুরুর ইঙ্গিত দেয়নি, তবে ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের আশা, দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান দ্রুত শেষ হবে।
এই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের ফলে সাধারণ ভ্রমণকারী এবং বিশেষ করে ইতালিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বিদেশি নাগরিকদের যাতায়াতে কিছুটা বিলম্ব বা অতিরিক্ত তল্লাশির সম্মুখীন হতে হতে পারে। বিশেষ করে সড়ক বা আকাশপথে স্পেন থেকে ইতালি প্রবেশের সময় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট সাথে রাখা এবং তল্লাশিতে সহযোগিতা করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আপাতত দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে সেউটার অভিবাসী পরিস্থিতির স্বাভাবিকীকরণের ওপর।
ইতালি-স্পেন সীমান্তে শেনজেন নিয়ন্ত্রণ আরও ১৫ দিন বাড়ানো হয়েছে; সেউতার অভিবাসন সংকট অব্যাহত থাকলেও রোম আশা করছে এটিই হবে শেষবারের মতো এই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ।
ansa


