ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইস্ট্যাটের (Istat) নতুন প্রতিবেদনে বার্ধক্য ও জন্মহার হ্রাসের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে; বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনকি অভিবাসন প্রবাহও এই জনসংখ্যার বিশাল ঘাটতি মেটাতে সক্ষম হবে না।
এক দীর্ঘমেয়াদী জনতাত্ত্বিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে ইউরোপের অন্যতম শিল্পোন্নত দেশ ইতালি। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানগত পূর্বাভাসে দেখা গেছে, আগামী ২০৮০ সাল নাগাদ দেশটির জনসংখ্যা বর্তমানের তুলনায় ১ কোটি ৩০ লক্ষেরও বেশি হ্রাস পেতে পারে। ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইস্ট্যাট (Istat) তাদের ২০৮০ সাল পর্যন্ত মেয়াদী এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানের ৫ কোটি ৮৯ লক্ষ জনসংখ্যা থেকে কমে আগামী ৫৫ বছরে ইতালির বাসিন্দা সংখ্যা দাঁড়াবে মাত্র ৪ কোটি ৫৮ লক্ষে।
দ্রুত পরিবর্তনের পথে ইতালির সমাজ
ইস্ট্যাটের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন আগামী কয়েক দশক ধরে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। মাত্র ২৪ বছর পর অর্থাৎ ২০৫০ সাল নাগাদ ইতালির জনসংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষ কমে ৫৫ মিলিয়নে গিয়ে ঠেকবে। এই পরিবর্তনের প্রভাব পুরো দেশে সমানভাবে পড়বে না। বিশেষ করে ইতালির দক্ষিণাঞ্চল (Mezzogiorno) এবং গ্রাম্য অভ্যন্তরীণ এলাকাগুলো বড় শহরগুলোর তুলনায় অনেক দ্রুত জনশূন্য হয়ে পড়বে। সংস্থার মতে, ‘বেবি বুম’ প্রজন্মের বার্ধক্যে পদার্পণই ইতালির এই দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ।
শ্রমশক্তি ও বার্ধক্যের চ্যালেঞ্জ
জনসংখ্যা কমার পাশাপাশি ইতালির গড় বয়সও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ২০২৫ সালে ইতালীয়দের গড় বয়স যেখানে ৪৬.৯ বছর, ২০৫০ সালে তা বেড়ে ৫১ বছরে উন্নীত হবে। ঐ সময়ে ৬৫ ঊর্ধ্ব প্রবীণদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৩৪.৫ শতাংশে পৌঁছাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশটির অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে। ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫৫.৩ শতাংশে দাঁড়াবে, যার ফলে ভবিষ্যতে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিতে পারে।

একাকীত্ব ও পারিবারিক কাঠামোর বিবর্তন
প্রতিবেদনের একটি চাঞ্চল্যকর দিক হলো ইতালীয়দের একাকী জীবনযাপনের প্রবণতা। ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে একা বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ২০৫০ সাল নাগাদ একা থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৭ শতাংশেরই বয়স হবে ৬৫ বছরের বেশি। পারিবারিক ক্ষেত্রেও আসবে বড় বদল। ২০৫০ সালে দেখা যাবে, চারটির মধ্যে একটি পরিবারে কোনো দম্পতি বা সন্তান নেই। এমনকি সন্তানহীন দম্পতির সংখ্যা (২১.৪%) সন্তান থাকা দম্পতির (২১.১%) চেয়ে বেশি হয়ে যাবে, যা ইতালির সামাজিক ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
জন্ম-মৃত্যুর ব্যবধান এবং অভিবাসন
ইস্ট্যাটের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ইতালিতে মৃত্যুহার ক্রমান্বয়ে বাড়বে এবং ২০৫৮ সালে তা সর্বোচ্চ ৮ লক্ষ ৬৯ হাজারে পৌঁছাবে। অন্যদিকে, জন্মহার কমতে কমতে ২০৮০ সালে বছরে মাত্র ২ লক্ষ ৮১ হাজারে নেমে আসবে। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, “ভবিষ্যতের জন্মহার প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হবে না।”
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিশাল শূন্যতা পূরণে অভিবাসীরাও পর্যাপ্ত হবে না। যদিও ইতালিতে অভিবাসীদের আগমন অব্যাহত থাকবে, তবে তা জন্ম ও মৃত্যুর এই বিশাল ফারাক ঘোচাতে পারবে না। ২০২৫ সালে ৪ লক্ষ ৩২ হাজার অভিবাসী আসার সম্ভাবনা থাকলেও ২০৫০ সালে তা কমে ৩ লক্ষ ৭২ হাজারে নামতে পারে। সব মিলিয়ে, এক অনিশ্চিত জনতাত্ত্বিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ইতালি, যেখানে জনশূন্যতা ও বার্ধক্যই হয়ে উঠবে দেশটির প্রধান সংকট।
ইস্ট্যাটের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৮০ সালে ইতালির জনসংখ্যা ৫৮.৯ মিলিয়ন থেকে কমে ৪৫.৮ মিলিয়নে নামবে; বাড়বে প্রবীণ ও একাকী মানুষের সংখ্যা, কমবে জন্মহার ও কর্মক্ষম জনসংখ্যা।
ansa


