২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন আশ্রয় ব্যবস্থার অধীনে ইতালিতে অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায় বার্লিন; রোমের আপত্তিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছে জার্মান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থী অভিবাসীদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে জার্মানি ও ইতালির মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। ডাবলিন চুক্তি বা ‘ডাবলিন রেগুলেশন’ অনুযায়ী যেসব অভিবাসী প্রথম ইতালিতে নিবন্ধিত হয়ে পরবর্তীতে জার্মানিতে প্রবেশ করেছেন, তাদের পুনরায় ইতালিতে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তে অনড় অবস্থানের কথা জানিয়েছে বার্লিন। জার্মানির এই ঘোষণায় ইতালির রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলেও, জার্মান সরকার বিষয়টিকে পূর্বনির্ধারিত চুক্তির বাস্তবায়ন হিসেবেই দেখছে।
সম্প্রতি জার্মান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, তথাকথিত ‘ডাবলিনান্টি’ বা ডাবলিন নিয়মভুক্ত অভিবাসীদের ইতালিতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। তিনি বলেন, “এই বিষয়টি নিয়ে রোমের পক্ষ থেকে যে অস্থিরতা বা ভিন্নমত দেখা যাচ্ছে, তাতে আমরা কিছুটা বিস্মিত। কারণ জার্মানি ও ইতালি দীর্ঘ সময় ধরে অভিবাসন ইস্যুতে এবং ইউরোপীয় সাধারণ আশ্রয় ব্যবস্থা (Common European Asylum System) বাস্তবায়নে অত্যন্ত ফলপ্রসূভাবে একে অপরকে সহযোগিতা করে আসছে।”
জার্মান সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষের দিকে ইতালি ও গ্রিসের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, ২০২৬ সালের জুন মাস থেকে ইউরোপের নতুন সাধারণ আশ্রয় ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে ডাবলিন নিয়মগুলো পুনরায় কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে। এর অর্থ হলো, নতুন ইইউ চুক্তির পর যেসব অভিবাসী ইতালিতে প্রথম প্রবেশ করবেন, তাদের জার্মানিতে পাওয়া গেলে পুনরায় ইতালিতেই ফেরত পাঠানো হবে।

তবে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা ভিমিনালে (Viminale) ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। ইতালীয় কর্তৃপক্ষের মতে, গত ১২ জুনের আগে যারা ইউরোপে প্রবেশ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়। জার্মানি অবশ্য এই নির্দিষ্ট সময়সীমার দাবিটি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছে। জার্মান মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেছেন যে, একটি সফল ইউরোপীয় আশ্রয় ব্যবস্থার জন্য ডাবলিন নীতির কার্যকর প্রয়োগ অপরিহার্য এবং এটি এই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। জার্মানি চায় অভিবাসী স্থানান্তরের এই প্রক্রিয়াটি যেন কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই বাধ্যতামূলক এবং কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়।
এদিকে, ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি এই বিতর্ককে খুব একটা বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন না। তাসকানি অঞ্চলের সান্ত’আন্না ডি স্তাজ্জেমা-তে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, জার্মানির সাথে এ নিয়ে বড় কোনো সংকট তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন না। তাজানি জার্মানির পতাকাবাহী এনজিও (NGO) জাহাজগুলোর প্রসঙ্গ টেনে আনেন, যারা ভূমধ্যসাগর থেকে অভিবাসীদের উদ্ধার করে ইতালীয় উপকূলে নিয়ে আসে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, একদিকে যেমন জার্মানি অভিবাসীদের ফেরত পাঠাতে চায়, অন্যদিকে তাদের এনজিও জাহাজগুলো অভিবাসীদের ইতালিতে নিয়ে আসছে—তাই দুই দেশের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জার্মানির এই কঠোর অবস্থান ইতালি বা ইউরোপের অন্যান্য দেশে থাকা অভিবাসীদের জন্য বড় চিন্তার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আসা যেসব অভিবাসী ইতালিকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে জার্মানি বা ফ্রান্সে যেতে চান, তাদের জন্য আইনি জটিলতা আরও বাড়বে। ডাবলিন চুক্তির কড়াকড়ির ফলে ভবিষ্যতে ইতালিতে আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়া অভিবাসীদের অন্য কোনো ইউরোপীয় দেশে স্থায়ী হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। বর্তমানে এই বিষয়টি নিয়ে ইইউ দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরির কাজ চলছে।
জার্মানি জুন ২০২৬ থেকে ডাবলিন বিধি পুনরায় কার্যকর করে ইতালিতে অভিবাসী ফেরত পাঠাবে। ২০২৫ সালের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে বার্লিন বলছে, এ স্থানান্তর প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
europa.today


