দীর্ঘদিন বন্দিদশা ও মৌলিক নাগরিক অধিকারবঞ্চিত হয়ে গ্রিসের সিনতিকি শিবিরে থাকা অভিবাসীরা মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন; অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রত্যাখ্যাতদের ফেরত পাঠাতে অভিবাসন নীতি আরও কঠোর করছে।
উত্তর গ্রিসের সিনতিকি (Sintiki) বন্ধ আটককেন্দ্রে দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় ধরে আটকে থাকা চার শতাধিক অভিবাসী চরম শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। এদের মধ্যে বড় একটি অংশই বাংলাদেশি ও মিশরীয় নাগরিক। কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ ছাড়া বন্দিশিবিরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দিনাতিপাত করায় অনেকেই এখন আত্মহত্যার কথা ভাবছেন। সম্প্রতি গ্রিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিবাসীদের এক যৌথ খোলা চিঠিতে এমন ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে তারা নিজেদের পরিস্থিতিকে ‘বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা বোমার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।
বুলগেরিয়া সীমান্তের প্রমাচোনাস গ্রামের কাছে ২০২০ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এই ‘পাইলট প্রকল্প’ চালু করা হয়। বর্তমানে সেখানে চার শতাধিক অভিবাসীর জন্য রয়েছে মাত্র চারটি শৌচাগার এবং তিনটি পানির কল। চিকিৎসক ও সাবেক বামপন্থি আইনপ্রণেতা আফ্রোদিতি স্তামবুলির অভিযোগ অনুযায়ী, শিবিরে আইনি পরামর্শকদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় না। বন্দিদের দিনে কেবল একবার খাবার সরবরাহ করা হলেও তা সংরক্ষণের কোনো ফ্রিজ নেই। এমনকি সেখানে কাপড় ধোয়ার কোনো যন্ত্র কিংবা পরিচ্ছন্নতার ন্যূনতম উপকরণও অমিল। ফলে বন্দিরা জটিল চর্মরোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। স্থানীয় কমিউনিটি প্রধান স্পাইরোস লিওনিদাস জানান, প্রতিকূল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এলাকাটিতে শীতে তাপমাত্রা মাইনাস ১০ ডিগ্রিতে নেমে যায় এবং গ্রীষ্মকালে তা সর্বোচ্চ ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে।

সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় আটক ব্যক্তিরা একাধিকবার সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করেছেন, যার ফলে রক্ষীদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় পুলিশ ইউনিয়ন জানায়, তীব্র সংঘাতের মুখে কেন্দ্রটির চারটি ব্লকের তিনটিই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রটির ভেতরের চিত্রকে একটি বোমাবিধ্বস্ত এলাকার সঙ্গে তুলনা করেছেন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তারা। এসব সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ৫০ জন অভিবাসীকে নতুন করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রিসের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ, মিশর ও পাকিস্তানের নাগরিকদের ক্ষেত্রে আশ্রয়ের আবেদন মঞ্জুর হওয়ার হার এক শতাংশেরও কম। চলতি বছরের জুনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর যাদের আশ্রয়ের উপযুক্ত মনে করা হচ্ছে না, তাদের বহিষ্কার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এমন বন্ধ কেন্দ্রগুলোতে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা হচ্ছে। জার্মানি ও ডেনমার্কসহ ইউরোপের পাঁচটি দেশ ইউনিয়নের বাইরে প্রত্যাখ্যাতদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে ‘রিটার্ন হাব’ গঠনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, গ্রিস তার অন্যতম প্রধান অংশীদার। এ বিষয়ে কৌশল নির্ধারণে ইউরোপের ১৭টি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
অভিবাসীদের এই মানবিক সংকটের কথা অস্বীকার করে গ্রিসের অভিবাসন ও আশ্রয়মন্ত্রী থানোস প্লেভরিস আটককেন্দ্রের পরিবেশকে ‘চমৎকার’ বলে দাবি করেছেন। তিনি অবকাঠামো ধ্বংসের জন্য অভিবাসীদের ওপর দায় চাপিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, নিজ দেশে বহিষ্কার না করা পর্যন্ত কাউকে মুক্তি দেওয়া হবে না। তবে শুরু থেকেই অভিবাসী শিবিরের বিরোধিতা করে আসা স্থানীয় প্রশাসন এটি অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে। সিনতিকির মেয়র জিওর্গোস তাতসিওস ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কোনো এলাকাবাসীই নিজেদের বসতিতে এমন অমানবিক বন্দিশিবির মেনে নিতে রাজি নয়।
গ্রিসের সিনতিকি আটককেন্দ্রে প্রায় ৪০০ বাংলাদেশি ও মিশরীয় অভিবাসী এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্দি; অমানবিক পরিবেশ, সীমিত খাবার-পানি ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে অনেকে আত্মহত্যার কথা ভাবছেন।
infomigrants


