উত্তরাঞ্চলীয় লম্বার্দি প্রদেশে টমেটো সংগ্রহের সময় প্রাণ হারালেন ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ; নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরেও প্রচণ্ড গরমে কাজ করানো নিয়ে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন।
ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় লম্বার্দি (Lombardy) প্রদেশের একটি টমেটো খেতে কাজ করার সময় ১৯ বছর বয়সী এক রোমানীয় অভিবাসী শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গত ৩ আগস্ট স্থানীয় কৃষি শ্রমিক ইউনিয়ন ‘এফএলএআই-সিজিআইএল’ (FLAI CGIL) এই মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছে। প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে মাঠে কাজ করার সময় অসুস্থ হয়ে ওই তরুণের মৃত্যু হয়, যা ইতালির কৃষি খাতে অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের শুরুর দিকে ক্রেমোনা (Cremona) শহরের নিকটবর্তী একটি খামারে টমেটো সংগ্রহের কাজ করছিলেন ওই তরুণ। গ্রীষ্মকালীন প্রখর রোদে কাজ করার সময় হঠাৎ তিনি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সহকর্মীরা দ্রুত জরুরি সেবায় খবর দিলে তাকে হেলিকপ্টারে করে ক্রেমোনার একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ বা ‘হিট স্ট্রোক’ এই মৃত্যুর কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ক্রেমোনা এলাকার শ্রমিক ইউনিয়ন প্রতিনিধি ফ্যাবিও সিং (Fabio Singh) এই ঘটনাকে একটি ‘পরিহারযোগ্য ট্র্যাজেডি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “লম্বার্দির এই অঞ্চলে টমেটো সংগ্রহের কাজ সাধারণত উন্নত যন্ত্রপাতির সাহায্যে করা হয়। যান্ত্রিকীকরণের এই যুগেও একজন তরুণকে এভাবে প্রাণ হারাতে হলো, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং সাধারণ নিয়মকানুনের প্রতি অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ।”

ইতালির ওই অঞ্চলে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহের কারণে স্থানীয় প্রশাসন দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মাঠে কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। তবে ইউনিয়ন নেতা ফ্যাবিও সিং এই নিয়মের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, “প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিকেল ৪টায় মাঠের তাপমাত্রা যা থাকে, ৫টাতেও প্রায় একই রকম গরম অনুভূত হয়। ফলে ৪টার পর কাজে ফিরলেও শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমছে না।”
ইউনিয়নটি আরও দাবি করেছে যে, শ্রমিকদের প্রায়ই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। কৃষি খেতে এই ধরনের মৃত্যু বন্ধ করতে কড়া নজরদারি ও নিয়মিত পরিদর্শনের কোনো বিকল্প নেই। চলতি বছরের শুরুর দিকে কৃষি খাতে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগের দাবি জানিয়েছিল ইউনিয়নগুলো, যা সরকার মেনে নিয়েছিল। ফ্যাবিও সিং একে একটি ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করলেও আক্ষেপ করে বলেন যে, পর্যাপ্ত মাঠপর্যায়ের তদারকি বা ইনস্পেকশনের অভাবে কাগজে-কলমে থাকা নিয়মগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
উল্লেখ্য যে, ইতালির এই অঞ্চলে সাধারণত নির্মাণ শিল্পে মৃত্যুর হার বেশি থাকলেও কৃষি খাতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ইতালিজুড়ে কৃষি খাতে কর্মরত বাংলাদেশিসহ হাজার হাজার বিদেশি অভিবাসীদের জন্য এই ঘটনা একটি অশনিসংকেত। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং মালিকপক্ষের অবহেলার কারণে প্রায়শই অভিবাসী শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে স্থানীয় প্রশাসন একটি তদন্ত শুরু করেছে যাতে মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং সেই সময় কোনো আইনি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা যায়।
শ্রমিক অধিকার রক্ষা কর্মীদের মতে, এই মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতি চলমান ব্যবস্থার উদাসীনতারই প্রতিফলন। তারা দ্রুত এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ট্র্যাজেডি রোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
লোম্বার্দিতে টমেটো তুলতে গিয়ে ১৯ বছর বয়সী রোমানীয় শ্রমিকের মৃত্যু কর্মক্ষেত্রে তাপজনিত ঝুঁকি ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর নজরদারি ও পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
infomigrants


