পর্যটনের চাপ কমাতে ইতালির ভাসমান শহর ভেনিসের পরীক্ষামূলক প্রবেশ ফি পদ্ধতি আশাতীত সাফল্য পেয়েছে। আগামীতে ভিড় সামলাতে টিকিটের মূল্য ৫০ ইউরো পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে স্থানীয় প্রশাসন।
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র ইতালির ভেনিস শহর এখন এক নতুন মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে। মাত্রাতিরিক্ত পর্যটকের (ওভারট্যুরিজম) চাপ সামলাতে পর্যটকদের ওপর প্রবেশ ফি আরোপ করার যে সাহসী ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শহর কর্তৃপক্ষ নিয়েছিল, তা অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, এই প্রবেশ টিকিট বিক্রি থেকে ভেনিস পৌরসভা ইতিমধ্যে ৫০ লাখ ইউরোরও (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৫ কোটি টাকার বেশি) বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করেছে।
ভেনিসই বিশ্বের একমাত্র শহর, যেখানে ঐতিহাসিক কেন্দ্রগুলোতে প্রবেশের জন্য পর্যটকদের বাধ্যতামূলকভাবে ফি প্রদান করতে হচ্ছে। মূলত শহরের পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ছয় লাখেরও বেশি ‘ডে-ট্রিপার’ বা দিনে এসে দিনে ফিরে যাওয়া পর্যটক নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে এই নান্দনিক ভাসমান শহরে প্রবেশ করেছেন।
উল্লেখ্য, গত দুই বছর আগে ভেনিস পৌরসভা পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রবেশ ফি ব্যবস্থা প্রবর্তনের পরিকল্পনা হাতে নেয়। পর্যটনের মৌসুমে শহরের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। চলতি বছরে এই উদ্যোগটির প্রথম ধাপের সফল সমাপ্তি কর্তৃপক্ষকে আরও বড় পদক্ষেপ নেওয়ার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে। নগর কাউন্সিলের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, পর্যটনের ব্যস্ততম দিনগুলোতে অর্থাৎ ‘পিক ডেস’-এ ভিড় কমাতে টিকিটের দাম বর্তমানের তুলনায় কয়েকগুণ বাড়িয়ে ৫০ ইউরো পর্যন্ত নির্ধারণের বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হচ্ছে।
নগর কর্তৃপক্ষের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, কেবল রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য নয়। বরং ভেনিসের মতো একটি সংবেদনশীল এবং ঐতিহ্যবাহী শহরের ওপর মানুষের বাড়তি চাপ কমিয়ে আনা এবং পর্যটকদের আগমন বছরের বিভিন্ন সময়ে সুষমভাবে ছড়িয়ে দেওয়াই এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য। দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের কারণে শহরটির ঐতিহাসিক অবকাঠামো এবং স্থানীয়দের সামাজিক জীবনে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা প্রশমিত করতে এই ফি একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

এই নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যারা আগে থেকে টিকিট সংগ্রহ না করে শহরে প্রবেশের চেষ্টা করেন, তাদের জন্য আরও কঠোর জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ের এই সফলতার পর কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে যখন পর্যটকদের ঢল নামে, তখন উচ্চমূল্যের টিকিট ব্যবস্থার মাধ্যমে আগন্তুকদের নিরুৎসাহিত করার কৌশল নেওয়া হতে পারে।
ভেনিসের এই মডেলটি এখন বিশ্বের অন্যান্য পর্যটনপ্রধান শহরগুলোর জন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের অনেক শহর যারা অতিরিক্ত পর্যটনের সমস্যায় ভুগছে, তারা ভেনিসের এই ‘এন্ট্রি ফি’ মডেলটি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে ইতালিতে বসবাসরত বিদেশি নাগরিক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন যে, যারা নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে (যেমন— হোটেল বুকিং বা স্থানীয় বাসিন্দা) পড়বেন, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আগামী দিনগুলোতে ভেনিসের এই প্রবেশ ফি ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ নিলে তা পর্যটন শিল্পে এক নতুন ধারার সূচনা করবে। একদিকে যেমন ঐতিহাসিক শহরের ঐতিহ্য সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে টেকসই পর্যটন নিশ্চিতের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কর্তৃপক্ষের পরবর্তী লক্ষ্য হলো আগামী বছরের পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই টিকিটিং সিস্টেম এবং মূল্য নির্ধারণের নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত করা।
অতিরিক্ত পর্যটন নিয়ন্ত্রণে চালু করা প্রবেশ ফি থেকে ৫০ লাখ ইউরোর বেশি আয় করেছে ভেনিস, আর নির্ধারিত ফি দিয়ে শহরে প্রবেশ করেছেন সাড়ে ছয় লাখের বেশি ডে-ট্রিপার।
ভেনিস পৌরসভা (Comune di Venezia)


