ইতালির ডাকবিভাগে নতুন দিগন্ত: প্রবাসীদের দাপ্তরিক কাজ সহজ করতে চালু হলো বহুভাষিক সেবা

4 Min Read

ইতালির আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ভাষাগত বাধা দূর করতে মিলান ও পার্শ্ববর্তী এলাকার পোস্ট অফিসগুলোতে অভিনব এক উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির জাতীয় ডাকবিভাগ ‘পোস্তে ইতালিয়ান’ (Poste Italiane); এর ফলে এখন থেকে অভিবাসীরা নিজস্ব ভাষায় রেসিডেন্স পারমিটসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।

মাদ্রিদ:

ইতালিতে বসবাসরত অভিবাসীদের জন্য সরকারি দপ্তরগুলোতে ভাষাগত জটিলতা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে যারা নতুন এসেছেন বা ইতালীয় ভাষায় এখনো দক্ষ হয়ে ওঠেননি, তাদের জন্য রেসিডেন্স পারমিট (Permesso di Soggiorno) বা অন্যান্য সেবার ফরম পূরণ করা বেশ দুরূহ হয়ে পড়ে। এই সমস্যার কার্যকর সমাধানে মিলান ও এর সংলগ্ন সেস্তো সান জিওভান্নি (Sesto San Giovanni) এলাকার ডাকবিভাগ বা পোস্ট অফিসগুলোতে এখন বহুভাষিক সেবা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে এই অফিসগুলোর ডিজিটাল মনিটর বা ‘টোটেম’ স্ক্রিনে ইতালীয় ভাষার পাশাপাশি আরবি ও স্প্যানিশ ভাষায় নির্দেশনা প্রদর্শিত হচ্ছে।

সেস্তো সান জিওভান্নি এলাকাটি ইতালির লম্বার্দিয়া অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। প্রায় ৭৮ হাজার বাসিন্দার এই শহরে মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশই বিদেশি বংশোদ্ভূত, যাদের অধিকাংশই মিশরীয় বা দক্ষিণ আমেরিকান দেশগুলো থেকে আসা। এই বিপুল সংখ্যক অভিবাসীর কথা মাথায় রেখেই স্থানীয় পোস্ট অফিসগুলোতে বিশেষ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখানে টোটেম মেশিন থেকে সিরিয়াল নম্বর বা টিকিট সংগ্রহের সময় এখন ব্যবহারকারীরা নিজেদের সুবিধামতো ভাষা বেছে নিতে পারছেন।

এই প্রকল্পের অন্যতম চালিকাশক্তি হলেন ডাকবিভাগের বহুভাষিক কর্মীরা। লরা বোলেস (Laura Boles) নামক একজন কর্মী জানান, যখন গ্রাহক এবং কর্মকর্তা উভয়েই একই ভাষায় কথা বলতে পারেন, তখন যেকোনো সমস্যার সমাধান অনেক দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হয়। পোস্ট অফিসগুলোর মূল লক্ষ্য হলো স্থানীয় কমিউনিটির সাথে দাপ্তরিক দূরত্ব কমিয়ে আনা। বিশেষ করে যারা রেসিডেন্স পারমিট বা ‘কিট’ জমা দিতে আসেন, তাদের জন্য ভাষাগত সহযোগিতা একটি বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা দিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গ্রীষ্মকালীন সময়ে বা ব্যস্ত দিনগুলোতে এই অফিসগুলোতে প্রতিদিন গড়ে অন্তত ২০টিরও বেশি রেসিডেন্স পারমিটের আবেদন জমা পড়ছে।

ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ইস্তাত’ (ISTAT)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক নগরী মিলানে বর্তমানে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার বিদেশি নাগরিক বসবাস করেন, যা শহরটির মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দাপ্তরিক প্রয়োজন মেটাতে মিলানের তিনটি কৌশলগত এলাকায় বহুভাষিক পোস্ট অফিস কার্যক্রম বর্তমানে পূর্ণদমে চলছে। এলাকাগুলো হলো— পাওলো সার্পি (Paolo Sarpi), মিলান সেন্ট্রাল স্টেশন সংলগ্ন এলাকা এবং করভেত্তো (Corvetto)।

এই বহুভাষিক সেবা কেবল প্রশাসনিক কাজই সহজ করছে না, বরং এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইমিগ্রেশন অফিসে কর্মরত মিশরীয় বংশোদ্ভূত কর্মী ক্রিস্টিয়ানা জানান, এই উদ্যোগের ফলে বিশেষ করে প্রবাসী নারীরা এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন। আগে যারা ভাষার ভয়ে একা বাইরে আসতে দ্বিধা করতেন, তারা এখন সরাসরি নিজেদের ভাষায় কথা বলতে পারার নিশ্চয়তা পেয়ে বিভিন্ন সরকারি ভাতার (Sussidio) আবেদন বা বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল (Bolletta) প্রদানের মতো কাজগুলো নিজেরাই করতে পারছেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নারীরা তাদের স্বামীদেরও বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে সাহায্য করছেন।

পোস্ট অফিসগুলোর এই ‘এথনিক’ বা বহুভাষিক শাখাগুলোতে সাধারণ ডাক পরিষেবার পাশাপাশি চিঠিপত্র আদান-প্রদান এবং অর্থ স্থানান্তরের মতো প্রচলিত সেবাগুলোও যথারীতি চালু রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইতালীয় ডাকবিভাগের এই আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ অন্যান্য সরকারি দপ্তরের জন্যও একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে, যা ইতালিতে বসবাসরত অভিবাসীদের মূলধারার সাথে একীভূত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই উদ্যোগের ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মতো অন্যান্য বিদেশি নাগরিকরাও ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরিসরে নিজস্ব ভাষায় সেবার সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

মিলানে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার বিদেশি বাসিন্দা রয়েছেন; ভাষাগত বাধা কমাতে শহরের ৩টি পোস্ট অফিসে বহুভাষিক কর্মীরা রেসিডেন্স পারমিটসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সেবায় সহায়তা করছেন।

ISTAT (Italian National Institute of Statistics)

TAGGED:
Share This Article