উত্তর আফ্রিকার সিউটা সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ইতালির সীমান্ত রক্ষায় ‘অসাধারণ ব্যবস্থা’ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন।
ইউরোপের অন্যতম প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত উত্তর আফ্রিকার স্প্যানিশ ছিটমহল সিউটাতে (Ceuta) সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন প্রবাহের ছবিগুলো মহাদেশীয় রাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এই সংকটকে কেন্দ্র করে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি (Giorgia Meloni) অত্যন্ত কড়া এবং আপোষহীন অবস্থান নিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, বর্তমানের এই অনিয়ন্ত্রিত অবৈধ অভিবাসন ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য একটি সরাসরি এবং বাস্তব হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সিউটা সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার মানুষের এই প্রবেশের দৃশ্যগুলো ইতালীয় প্রশাসনের নজরে আসার পর প্রধানমন্ত্রী মেলোনি ইতালির অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী (Interior Minister) মাত্তেও পিয়ান্তেদোসির (Matteo Piantedosi) সাথে এক জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন যে, ইতালি এই পরিস্থিতি কেবল দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করবে না। নিজ দেশের সীমানা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তার সরকার প্রয়োজনে অত্যন্ত কঠোর এবং অসাধারণ (Extraordinary) কিছু পদক্ষেপ নিতেও দ্বিধা করবে না।
ইতালি সরকারের পক্ষ থেকে আসা সবথেকে বড় হুঁশিয়ারিটি হলো স্পেনের সাথে শেনজেন (Schengen) মুক্ত চলাচল চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করার সম্ভাবনা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট সকল নিরাপত্তা সংস্থা এবং উচ্চপর্যায়ের কমিটিগুলোর সাথে আলোচনার পরই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। যদি শেনজেন চুক্তি স্থগিত করা হয়, তবে ইউরোপের অভ্যন্তরে পাসপোর্টহীন অবাধ চলাচলের যে বিশেষ সুবিধা রয়েছে, তা স্পেনের ক্ষেত্রে বাতিল হয়ে যাবে এবং সীমান্তে পুনরায় কড়া পুলিশি তল্লাশি শুরু হবে।
মেলোনি সরকার তাদের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অবৈধ অভিবাসনের বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করে আসছে। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, অবৈধ অভিবাসনের প্রশ্নে তার প্রশাসন “এক ইঞ্চিও ছাড় দেবে না”। সীমান্ত প্রতিরক্ষা জোরদার করা, আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারীদের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা এবং অবৈধভাবে আসা ব্যক্তিদের কার্যকরভাবে দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর (Effective Repatriations) যে নীতি বর্তমান সরকার গ্রহণ করেছে, তা আগামী দিনগুলোতে আরও শক্তিশালী করা হবে।

ইতালির এই অবস্থান মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (EU) একটি বিশেষ বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রোম বোঝাতে চাইছে যে যদি সদস্য দেশগুলোর সীমান্ত রক্ষা করা না যায়, তবে পুরো মহাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সামাজিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়বে। বিশেষ করে অবৈধ পথে আসা মানুষের ঢল যদি বন্ধ না হয়, তবে অভ্যন্তরীণ নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের ফলে ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীসহ অন্যান্য বিদেশি নাগরিকদের চলাচলেও প্রভাব পড়তে পারে। শেনজেন এলাকা স্থগিত হওয়ার অর্থ হলো ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াতে আগের মতো কড়াকড়ি এবং পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মুখে পড়া। এটি বিশেষ করে যারা কাজের সূত্রে বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন, তাদের জন্য সময়সাপেক্ষ এবং কিছুটা জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী মেলোনি জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে ধারাবাহিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকগুলোর ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই ইতালি সরকার তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ ঘোষণা করবে। আপাতত ইতালির এই কড়া অবস্থান ইউরোপীয় রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং সীমান্ত সুরক্ষাকে আবারো জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
উক্ত বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, ইতালির বর্তমান সরকার কেবল দেশের ভেতরেই নয়, বরং পুরো ইউরোপের সীমান্ত রক্ষায় নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী এবং এই লক্ষ্যে তারা যেকোনো ধরনের কূটনৈতিক বা প্রশাসনিক লড়াইয়ে নামতে প্রস্তুত। শেনজেন স্থগিত করার মতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা ইউরোপের দীর্ঘদিনের অখণ্ডতা ও মুক্ত চলাচলের ধারণাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
সিউতা অভিবাসন সংকটের জেরে স্পেনের সঙ্গে শেনজেন ব্যবস্থা স্থগিতের মতো কঠোর পদক্ষেপ বিবেচনা করছে ইতালি, পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবপাচার প্রতিরোধ ও কার্যকর প্রত্যাবাসনে জোর দিচ্ছে সরকার।
জর্জিয়া মেলোনির অফিসিয়াল X অ্যাকাউন্ট


