অদম্য অরিন্দম: রোমে প্রতিবন্ধকতা জয় করে এক প্রবাসী বাংলাদেশি শিশুর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা

4 Min Read

ডাউন সিনড্রোম ও অটিজমে আক্রান্ত শিশুটি দীর্ঘদিনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে এখন কথা বলতে ও হাঁটতে শুরু করেছে; ইতালীয় স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিশেষায়িত পুনর্বাসন কেন্দ্রের সমন্বিত প্রচেষ্টায় মিলেছে নতুন আশার আলো।

মাত্র দুই বছর আগের চিত্র ছিল ভয়াবহ। সাড়ে চার বছর বয়সী ছোট্ট অরিন্দম (ছদ্মনাম) না পারতো হাঁটতে, না পারতো কথা বলতে। কারো চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা বা সামাজিক মেলামেশা ছিল তার জন্য এক প্রকার অসম্ভব। অপরিচিত কাউকে দেখলে ভয়ে হাতে থাকা জিনিসপত্র ছুঁড়ে মারত সে। কিন্তু আজ সেই অরিন্দমের জীবনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। সে এখন হাসছে, খেলছে, হাঁটছে এবং এমনকি কয়েকটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারছে। ইতালির রাজধানী রোমে বসবাসরত এক প্রবাসী বাংলাদেশি দম্পতির এই শিশুটির জীবন বদলে যাওয়ার গল্পটি এখন অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।

রোমে জন্ম নেওয়া অরিন্দম জন্মগতভাবেই ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত। এর পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি এবং থাইরয়েডের নানা জটিলতা নিয়ে তার জন্ম হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসকরা তার মধ্যে অটিজমের লক্ষণও শনাক্ত করেন। ইতালিতে বসবাসরত তার বাংলাদেশি বাবা-মায়ের জন্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। একদিকে ভাষা বোঝার সমস্যা, অন্যদিকে অসুস্থ সন্তানের প্রতি বিশেষ যত্নের অভাব—সব মিলিয়ে এক গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছিল পরিবারটি। লোকলজ্জা আর সামাজিক বিড়ম্বনার ভয়ে তারা শিশুটিকে ঘরের বাইরে বের করতেও দ্বিধাবোধ করতেন। এমনকি শিশুটিকে কখনো কোনো পার্কেও নিয়ে যাওয়া হয়নি।

অরিন্দমের এই অন্ধকার জীবনে পরিবর্তনের সূচনা হয় ইতালির সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা ‘এএসএল রোমা ১’ (Asl Roma 1)-এর হস্তক্ষেপে। সংস্থাটির মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ (TSMREE) শিশুটিকে ‘অপেরা সান্ত দে সানক্টিস’ (Opera Sante de Sanctis) নামক একটি বিশেষায়িত পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানোর সুপারিশ করে। ১৮৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি ইতালিতে শিশু নিউরোসাইকিয়াট্রি বা স্নায়ুচিকিৎসার অন্যতম পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এখানে আসার পরই অরিন্দমের জন্য একটি সমন্বিত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

অরিন্দমের সুস্থতার পেছনে একটি শক্তিশালী সামাজিক ও চিকিৎসা নেটওয়ার্ক কাজ করেছে। শুরুতে তার জন্য ‘নিউরোসাইকোমোটর থেরাপি’ চালু করা হয়, যা তাকে হাঁটতে এবং হাতের আঙুলের ব্যবহার শিখতে সাহায্য করে। এরপর শ্রবণযন্ত্রের সহায়তায় শুরু হয় স্পিচ থেরাপি বা লোগোপিডি। তবে কেবল অরিন্দমের চিকিৎসাই নয়, তার বাবা-মায়ের জন্যও শুরু হয় বিশেষ কাউন্সেলিং। একজন দক্ষ সোশ্যাল ওয়ার্কারের সহায়তায় তারা ইতালীয় ভাষা শেখেন এবং সন্তানের চিকিৎসার প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের সাথে সরাসরি কথা বলতে শুরু করেন। ইতালির বিশেষ সুরক্ষা আইন ‘লেজ্জে ১০৪’ (Law 104)-এর আওতায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ এবং বিদ্যালয়ে বিশেষ সহায়কের অধীনে ভর্তির বিষয়গুলোও এই পুনর্বাসন কেন্দ্রটি তদারকি করেছে।

অরিন্দমের এই দীর্ঘ সংগ্রামের সবচেয়ে বড় সাফল্যটি আসে গত গ্রীষ্মে। দীর্ঘদিনের জড়তা কাটিয়ে সে তার বাবা-মায়ের সাথে বাংলাদেশে গিয়ে দাদা-দাদির সাথে দেখা করেছে। যে শিশুটি এক সময় ঘর থেকেই বের হতো না, তার এই সুদীর্ঘ বিমান ভ্রমণ এবং স্বজনদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করা ছিল চিকিৎসকদের কাছে এক বড় উপহার। অরিন্দমের এক সোশ্যাল ওয়ার্কার ফ্লাভিয়া রাপোনি বলেন, “কয়েক বছর আগেও এমন একটি সফর কল্পনা করা অসম্ভব ছিল।”

সান্ত দে সানক্টিস-এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট মার্কো ভ্যালেরিও দে সানক্টিস এই সাফল্য সম্পর্কে বলেন, “অরিন্দমের এই জয় প্রমাণ করে যে, সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ, বিশেষজ্ঞ কেন্দ্র এবং পরিবারের মধ্যে সঠিক সমন্বয় থাকলে যেকোনো প্রতিবন্ধকতা জয় করা সম্ভব। সমাজিক ও স্বাস্থ্য সেবাগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগালে হতাশায় ডুবে থাকা শিশুকেও সুন্দর ভবিষ্যৎ ফিরিয়ে দেওয়া যায়।” অরিন্দমের এই ফিরে আসা কেবল একটি পরিবারের জয় নয়, বরং এটি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মানবিক প্রচেষ্টার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।


ASL Roma 1, Opera Sante de Sanctis ও পরিবারের সমন্বিত সহায়তায় অরিন্দম হাঁটা, কথা বলা ও সামাজিকভাবে যোগাযোগে সক্ষম হয়েছে; থেরাপি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবায় বদলেছে তার জীবন।

genova.repubblica

Share This Article