মাদ্রিদের নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়াকে ‘ভুল ধারণা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী; অন্যদিকে নিজেদের অর্থনীতি ও শ্রমবাজার সচল রাখতে অনড় অবস্থানে রয়েছে স্পেন সরকার।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অভ্যন্তরীণ অভিবাসন নীতি নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নতুন করে বড় ধরনের মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। স্পেনে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক অনিয়মিত অভিবাসীকে আইনি মর্যাদা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছে। মাদ্রিদ তাদের এই সিদ্ধান্তকে জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে দাবি করলেও, সুইডেনসহ বেশ কিছু ইউরোপীয় রাষ্ট্র একে ইউনিয়নের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে শেঙেন অঞ্চলে অবাধ চলাচলের সুযোগ অপব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন স্পেনের এই উদ্যোগকে অত্যন্ত “খারাপ ধারণা” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, একবার কেউ স্পেনের বসবাসের অনুমতি পেয়ে গেলে শেঙেন (Schengen) চুক্তির আওতায় পুরো ইউরোপে অবাধে চলাচলের সুযোগ পাবে। ক্রিস্টারসন আশঙ্কা করছেন যে, স্পেনের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব কেবল একটি দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ‘সেকেন্ডারি অভিবাসনের’ মাধ্যমে অন্য দেশগুলোতেও এর প্রভাব পড়বে। গত জুন মাসে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় কাউন্সিলেও তিনি এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন যে, ইউরোপের অনেক দেশই স্পেনের এই পদক্ষেপ নিয়ে শঙ্কিত।
অন্যদিকে, স্পেন এই কর্মসূচীকে “অ্যামনেস্টি” বা নির্বিচার ক্ষমা বলতে নারাজ। মাদ্রিদ সরকারের দাবি, এটি দেশে ইতিমধ্যে বসবাসরত মানুষদের আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসার একটি জাতীয় ব্যবস্থা। স্পেনের কৃষি, নির্মাণ, পরিচর্যা এবং আতিথেয়তা (Hospitality) খাতগুলো বর্তমানে প্রচণ্ড শ্রমিক সংকটে ভুগছে। এছাড়া দেশটির জনসংখ্যার বার্ধক্যজনিত সংকট মোকাবিলায় এই বিদেশি শ্রমিকদের নিয়মিত করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। নিয়মিতকরণের মাধ্যমে এই শ্রমিকদের কাজের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের থেকে কর আদায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগার সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে স্পেন। ইইউটুডে-র তথ্যমতে, স্পেনের এই কর্মসূচীর আওতায় ইতোমধ্যে ১০ লক্ষেরও বেশি আবেদন জমা পড়েছে, যা বর্তমানে মূল্যায়ন পর্যায়ে রয়েছে।

সমালোচকদের প্রধান যুক্তি হলো, যদিও স্প্যানিশ রেসিডেন্স পারমিট সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়ন নাগরিকত্বের সমান নয়, তবুও এটি শেঙেনভুক্ত দেশগুলোতে স্বল্পমেয়াদী ভ্রমণের আইনি পথ খুলে দেয়। দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যক্তিরা ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে ইউরোপের অন্য দেশে চলে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই ঝুঁকি কিছুটা অতিরঞ্জিত। কারণ প্রতিটি দেশের নিজস্ব শ্রম আইন এবং বসবাসের কঠোর নিয়মাবলী বলবৎ থাকে, যা ঢালাও চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করে।
বিতর্কের আরেকটি স্পর্শকাতর দিক হলো মানব পাচারকারীদের ভূমিকা। সমালোচকরা মনে করেন, এ ধরনের বড় মাপের নিয়মিতকরণ অনিয়মিতভাবে ইইউতে প্রবেশ করতে আগ্রহীদের মনে এক ধরণের প্রত্যাশা তৈরি করে, যাকে পাচারকারীরা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তবে ইইউ অভিবাসন কমিশনার ম্যাগনুস ব্রুনার জানিয়েছেন, নিয়মিতকরণের ঘোষণার সাথে সীমান্তে নতুন করে অভিবাসী ঢল নামার সরাসরি কোনো অকাট্য প্রমাণ এখনো মেলেনি।
বসবাসের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি প্রতিটি দেশের নিজস্ব জাতীয় এখতিয়ারভুক্ত হলেও, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিন্ন আইনি কাঠামোর কারণে এই দ্বিপাক্ষিক বিরোধ এখন একটি ইউনিয়নের সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ব্রাসেলসের (Brussels) নীতিনির্ধারকরা এখন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বিত নিয়ম তৈরির মাধ্যমে এই টানাপোড়েন কমানোর চেষ্টা করছেন। স্পেনের এই সাহসী সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় জোটের মধ্যে নতুন কোনো দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করে কি না, আন্তর্জাতিক মহল এখন সেদিকেই গভীর নজর রাখছে। তবে আপাতত স্পেন তাদের অর্থনীতি বাঁচাতে এবং অনিয়মিত অভিবাসীদের ছায়া জীবন থেকে বের করে আনতে নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।
স্পেনের বৃহৎ অভিবাসী নিয়মিতকরণকে শ্রমঘাটতি মোকাবিলার উদ্যোগ বললেও, সুইডেন আশঙ্কা করছে আইনি মর্যাদা পাওয়া অভিবাসীদের শেঙেনজুড়ে অবাধ চলাচল নতুন সেকেন্ডারি অভিবাসনের ঝুঁকি তৈরি করবে।
infomigrants


