টরন্টো থেকে ঢাকা ফেরার পথে ইতালির রোমে কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায় ৪০ ঘণ্টা আটকে থাকা এবং যাত্রীদের অমানবিক কষ্টের ঘটনায় কঠোর অবস্থানে বিমান কর্তৃপক্ষ; গঠন করা হয়েছে অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি।
কানাডার টরন্টো থেকে ঢাকা ফেরার পথে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দীর্ঘ সময় যাত্রীদের চরম ভোগান্তির ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে কর্তৃপক্ষ। ইতালির রোম বিমানবন্দরে প্রায় ৪০ ঘণ্টা ফ্লাইটটি আটকে থাকার ঘটনায় একটি উচ্চপর্যায়ের অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) বোসরা ইসলামকে তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিমানের বর্তমান অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা জনসংযোগ প্রধান মহিউদ্দিন আহমেদ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে রোমের ঘটনার প্রেক্ষাপটে তাকে সরানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে দাপ্তরিকভাবে স্পষ্ট কোনো কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি। গত রোববার বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার মডেলের ফ্লাইটটি (বিজি-৩০৬) ২৪৭ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের খবর সামনে আসে।
ভয়াবহ ৪০ ঘণ্টার অভিজ্ঞতা:
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত বৃহস্পতিবার, যখন আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে উড়োজাহাজটি টরন্টো থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে। যাত্রাপথের প্রায় ৮ ঘণ্টা পর কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়লে উড়োজাহাজটি ইতালির ফিউমিচিনো (Fiumicino) বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়। যাত্রীদের অভিযোগ, অবতরণের পর প্রথম ৮ ঘণ্টা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) বন্ধ থাকা অবস্থায় তাদের উড়োজাহাজের ভেতরেই বসিয়ে রাখা হয়। এতে শিশু ও বৃদ্ধসহ অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘ সময় পর তাদের টার্মিনালে নামানো হলেও দুর্ভোগের মাত্রা কমেনি।

পাসপোর্ট বৈষম্য ও আবাসন সংকট:
রোমে আটকে পড়া যাত্রীদের মধ্যে দেখা দেয় এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিভাজন। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী যাত্রীরা জানিয়েছেন, যাদের কাছে মার্কিন বা কানাডিয়ান পাসপোর্ট ছিল, তাদের ইতালির ইমিগ্রেশন পার হয়ে হোটেলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় ১৭০ জন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রীকে ইমিগ্রেশন জটিলতা ও ভিসা না থাকায় বিমানবন্দরের লাউঞ্জেই রাত কাটাতে হয়। যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, টানা ৪০ ঘণ্টা তারা সাধারণ চেয়ারে বসে পার করেছেন। পর্যাপ্ত ঘুম, প্রয়োজনীয় ওষুধ, শিশুখাদ্য এবং ডায়াপারের সংকটে চরম বিপাকে পড়েন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সায়েম রানা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিমান কর্মকর্তাদের চরম সমন্বয়হীনতার কারণে আমাদের এই দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ারে বসে থাকা যে কতটা কষ্টের, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন।” আরেক যাত্রী শাহজাহান আলম এই অভিজ্ঞতাকে ‘যাযাবরের মতো জীবন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিমানের অবস্থান ও পরবর্তী পদক্ষেপ:
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, উড়োজাহাজটি মেরামতের জন্য ঢাকা থেকে একটি বিশেষ প্রকৌশলী দল এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ রোমে পাঠানো হয়েছিল। তাদের নিরলস প্রচেষ্টায় ত্রুটি সারানোর পর শনিবার রাতে ফ্লাইটটি পুনরায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। রোমে নিয়োজিত বিমানের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তারা সব যাত্রীর জন্যই হোটেলের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ইতালীয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কড়াকড়ির কারণে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের বাইরে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বিমানবন্দরের ভেতরে যাত্রীদের পর্যাপ্ত খাবার ও সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে বিমানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
বিমানের কারিগরি ত্রুটির সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। দীর্ঘ এই দুর্ভোগের ঘটনায় ভবিষ্যতে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিমান ও দূতাবাসের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয়ের দাবি তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
রোমে যান্ত্রিক ত্রুটিতে বিমান বাংলাদেশের বিজি-৩০৬ ফ্লাইটের ২৫৯ যাত্রী প্রায় ৪০ ঘণ্টা আটকে থাকার ঘটনায় অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে, জনসংযোগ প্রধানকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে।
bangla.thedailystar


