ইতালির ফোজ্জায় মর্মান্তিক পরিণতি: নিখোঁজ পাকিস্তানি শ্রমিকের মরদেহ মিলল নিজের গাড়ির ডিকিতে

4 Min Read

দুই সপ্তাহ নিখোঁজ থাকার পর ৩২ বছর বয়সী সাদ্দাম হোসেনের পচাগলা দেহ উদ্ধার; এলাকায় শোকের ছায়া ও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন ম্যানফ্রেডোনিয়ার মেয়র।

দক্ষিণ ইতালির ফোজ্জা (Foggia) প্রদেশে এক হাহাকার জাগানিয়া ঘটনার অবসান ঘটেছে। প্রায় ২০ দিন নিখোঁজ থাকার পর ৩২ বছর বয়সী এক পাকিস্তানি যুবকের পচাগলা মরদেহ তার নিজের গাড়ির ডিকি বা মালামাল রাখার খোলের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনায় স্থানীয় প্রবাসী সম্প্রদায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

নিহত যুবকের নাম সাদ্দাম হোসেন (৩২), যিনি পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন এবং ইতালির কৃষি প্রধান অঞ্চল ফোজ্জার খামারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। গত ২৩ আগস্ট, রবিবার বিকেলে বোরগো মেজানোন (Borgo Mezzanone) এলাকার কুখ্যাত ‘ঘেটো’ বা অভিবাসীদের অবৈধ বসতির পাশে পরিত্যক্ত একটি ধূসর রঙের সিট্রোয়েন সি৪ (Citroen C4) গাড়ির ভেতর থেকে তার মরদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ।

মরদেহ শনাক্তকরণ ও অন্তর্ধানের প্রেক্ষাপট

পুলিশ জানায়, সাদ্দামের ভাই নাজিম বেশ কয়েকদিন ধরে নিজের উদ্যোগে ভাইয়ের সন্ধান করছিলেন। তল্লাশিকালে তিনি হঠাৎ বোরগো মেজানোনের জনমানবহীন একটি এলাকায় সাদ্দামের গাড়িটি পড়ে থাকতে দেখেন। গাড়ির কাছে গিয়ে তিনি পচা দুর্গন্ধ পান এবং পুলিশে খবর দেন। পরবর্তীতে মরদেহটি এতটাই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে তা চেনা অসম্ভব ছিল, তবে সাদ্দামের হাতে থাকা একটি বিশেষ আংটি দেখে নাজিম নিশ্চিত করেন যে এটি তার নিখোঁজ ভাইয়ের মরদেহ।

সাদ্দামের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে গত ৮ আগস্ট পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়। তবে তার পরিবার জানায়, গত ৪ আগস্ট থেকেই তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। নিখোঁজ হওয়ার দিন সাদ্দাম চেরিনিয়োলার (Cerignola) বোরগো ত্রেসান্তি এলাকায় তার ভাইয়ের সাথে কৃষি খামারে কাজ শেষে নিজ বাড়িতে ফেরেন। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল এবং তার কোনো খোঁজ মিলছিল না।

তদন্ত ও হত্যাকাণ্ডের সন্দেহ

ইতালীয় পুলিশ এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগ (Scientifica) এই মৃত্যুকে ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে ধরে নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। যদিও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার আগে চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব নয়, তবে মরদেহটি সুপরিকল্পিতভাবে গাড়ির ডিকিতে লুকিয়ে রাখার ধরন দেখে গোয়েন্দাদের ধারণা, এটি একটি সহিংস মৃত্যুর ঘটনা। পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে সাদ্দাম যেখানে থাকতেন সেখান থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে এই জনমানবহীন এলাকায় তার গাড়িটি কে চালিয়ে নিয়ে এসেছিল এবং মৃত্যুর নেপথ্যে কারা জড়িত।

মানবেতর জীবন ও ন্যায়বিচারের দাবি

সাদ্দাম হোসেন ইতালিতে ‘বিশেষ সুরক্ষা’ পারমিট বা ‘পেরমেসো দি সোজর্নো পের প্রোতেজিয়োনে স্পেশালে’ (Permesso di soggiorno per protezione speciale) নিয়ে বসবাস করছিলেন। পরিবারের ঋণের বোঝা কমাতে এবং উন্নত জীবনের আশায় তিনি সুদূর পাকিস্তান থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ইতালিতে এসেছিলেন। ম্যানফ্রেডোনিয়ার (Manfredonia) মেয়র ডোমেনিকো লা মার্কা এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে নিহত সাদ্দামের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

মেয়র এক বিবৃতিতে বলেন, “সাদ্দামের মৃত্যু অত্যন্ত নৃশংস এবং অন্যায়। যে বস্তি বা ঘেটো এলাকায় তার মরদেহ পাওয়া গেছে, সেটি তার জন্য কারাগার এবং শেষ পর্যন্ত কবরে পরিণত হলো।” তিনি আরও জানান, সম্প্রতি রোমে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সাথে এক বৈঠকে এই ধরনের অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো স্থায়ীভাবে উচ্ছেদের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মানুষের মর্যাদা কোনোভাবেই স্বার্থের বিনিময়ে পণ্য হতে পারে না এবং সাদ্দামের মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার হওয়া জরুরি।

সাদ্দাম হোসেনের এই মর্মান্তিক মৃত্যু ইতালিতে কর্মরত হাজার হাজার বিদেশি কৃষি শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং বসবাসের চরম প্রতিকূল পরিবেশকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। পুলিশ বর্তমানে সাদ্দামের শেষ কল রেকর্ড এবং কর্মক্ষেত্রের সহকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে যাতে এই রহস্যময় মৃত্যুর জট খোলা সম্ভব হয়।

ফোজ্জায় নিখোঁজ পাকিস্তানি শ্রমিক সাদাম হোসাইনের মরদেহ গাড়ির ডিকি থেকে উদ্ধার; হত্যার সন্দেহে তদন্ত চলছে, আর বোরগো মেজানোনে শ্রমিকদের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

foggiatoday

Share This Article