গত এক দশক ধরে বলকান রুট পাড়ি দিয়ে আসা ক্লান্ত ও আহত অভিবাসীদের খাবার এবং চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন একদল স্বেচ্ছাসেবক। তবে ইতালির কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে মানবতাবাদী এসব প্রবীণ কর্মীকে এখন প্রতিনিয়ত ঘৃণা, থুতু নিক্ষেপ ও হামলার শিকার হতে হচ্ছে।
ইতালির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত শহর ত্রিয়েস্তের (Trieste) কেন্দ্রীয় রেলওয়ে স্টেশনের সামনের চত্বরটি প্রতিদিন সন্ধ্যায় এক ভিন্ন রূপ ধারণ করে। গত ১০ বছর ধরে এখানে জড়ো হন বলকান রুট (Balkan Route) হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করা ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত অভিবাসীরা। তাদের ক্ষতবিক্ষত পা আর ক্ষুধার্ত মুখের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন লোরেনা ফোরনাসিরসহ একদল নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক। তারা এই অভিবাসীদের খাবার, চিকিৎসাসেবা ও মানসিক সান্ত্বনা প্রদান করেন। কিন্তু মানবতার এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারীদের এখন প্রতিনিয়ত চরমপন্থী ও বর্ণবাদীদের ঘৃণা, হুমকি এবং সরাসরি শারীরিক হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে বিদ্বেষমূলক হামলা এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। স্বেচ্ছাসেবকদের লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে থুতু নিক্ষেপের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি এক ব্যক্তি লোরেনা এবং তার ৯০ বছর বয়সী স্বামীকে ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে রেখে প্রকাশ্যে হেনস্তা করে। ইতালির কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী ‘ফোরজা নোভা’ (Forza Nuova) পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। তারা এই স্বেচ্ছাসেবকদের স্টেশন এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ‘নিরাপত্তা টহল’ (Ronda per la sicurezza) এবং ‘উচ্ছেদ নোটিশ’-এর মতো হুমকিমূলক কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। পুলিশি উপস্থিতির মধ্যেও ডানপন্থীদের এই আস্ফালন সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
তবে ডানপন্থীদের এসব হুমকিতে মোটেই পিছিয়ে যাননি স্বেচ্ছাসেবকরা। বরং ‘ফোরনেলি রেজিসতেন্তি’ (Fornelli resistenti) নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক চরমপন্থীদের এসব হুমকির কড়া জবাব দিয়েছে। তারা স্টেশন চত্বরে তাদের উপস্থিতি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে, ঘৃণার চেয়ে মানবতার শক্তি অনেক বড়।

স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন লোরেনার ৯০ বছর বয়সী স্বামী। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এসে আমাকে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে, তা কখনো ভাবিনি। আমরা দুজন বয়স্ক মানুষ স্টেশনের সামনে কেবল অসহায়দের একটু সাহায্য করার চেষ্টা করি। এর বিনিময়ে কেউ আমাদের প্রতি এতটা তীব্র ঘৃণা পোষণ করতে পারে, তা আমার কল্পনারও অতীত ছিল।”
আরেকজন নারী স্বেচ্ছাসেবক তার কাজের পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানান, একটি শক্তিশালী পাসপোর্টের অধিকারী দেশে জন্মগ্রহণ করাটা তার জন্য নিছকই একটি সুবিধা। তিনি বলেন, “আমি এখানে আসি আমার সেই সৌভাগ্যকে এই অসহায় মানুষদের সাথে ভাগ করে নিতে। আমাদের এই সামান্য সহায়তার হাতটুকু যদি তাদের দিকে না বাড়িয়ে দিই, তবে তারা সহজেই হতাশা, শোষণ এবং অপরাধজগতের অন্ধকূপে তলিয়ে যেতে পারে।” চরমপন্থীদের হুমকিতে তারা ভীত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ওই স্বেচ্ছাসেবক বলেন, নিজেদের চেয়ে তারা তরুণ অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন।
এত ঘৃণা ও হুমকির মাঝেও ত্রিয়েস্তে স্টেশন চত্বরে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার এক অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ে। ওমার নামের ২১ বছর বয়সী এক আফগান তরুণের গল্প এর একটি বড় প্রমাণ। দীর্ঘ ও বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে ইতালিতে এসে লোরেনার মমতা পেয়েছিলেন তিনি। শত প্রতিকূলতার মাঝেও লোরেনার জন্মদিনের কথা ভোলেননি ওমার। নিজের গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এই তরুণ বলেন, “আমি তাকে সবসময় এখানে দেখি। তার মমতা এবং তিনি আমাদের জন্য যা করেন, তা আমার পক্ষে জীবনেও ভোলা সম্ভব নয়।”
ত্রিয়েস্তে স্বেচ্ছাসেবকেরা অভিবাসীদের চিকিৎসা ও সহায়তা দিচ্ছেন, কিন্তু ঘৃণা ও হামলার মুখেও মানবিকতা ধরে রেখে তাদের হতাশা, শোষণ ও অপরাধের ঝুঁকি থেকে রক্ষায় কাজ করছেন।
rainews


