ইতালিতে নাগরিকত্ব আইন সংস্কারের দাবিতে জোরালো আন্দোলন: বৈষম্যের শিকার ৯ লাখ শিক্ষার্থী

6 Min Read

ইতালির বর্তমান নাগরিকত্ব আইনকে ‘সেকেলে’ আখ্যা দিয়ে তা পরিবর্তনের দাবি তুলেছে বিভিন্ন সামাজিক ও শ্রমিক সংগঠন। দেশটিতে বসবাসরত প্রায় ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিদেশি হিসেবে গণ্য হওয়ায় তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

ইতালির বর্তমান নাগরিকত্ব আইন সংস্কার এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে নতুন করে জনমত তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি রোমে আয়োজিত ‘নাগরিকত্ব: একটি অধিকার, কোনো পুরস্কার নয়’ (Cittadinanza: un diritto, non un premio) শীর্ষক এক সম্মেলনে বক্তারা ইতালির ১৯৯২ সালের পুরনো নাগরিকত্ব আইনকে বর্তমান সময়ের জন্য অনুপযোগী বলে অভিহিত করেন। ইতালির অন্যতম বৃহৎ শিক্ষক ও শ্রমিক ইউনিয়ন এফএলসি সিজিআইএল (FLC CGIL) এবং আরও বেশ কিছু মানবাধিকার সংগঠন এই সম্মেলনের আয়োজন করে।

সংকটের মূলে বিদ্যমান আইন

বর্তমানে ইতালিতে ১৯৯২ সালের ৯১ নম্বর আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। এই আইনটি মূলত ‘ইয়াস সাঙ্গুইনিস’ (Ius Sanguinis) বা রক্তের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ফলে ইতালিতে জন্ম গ্রহণ করা বা শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা হাজার হাজার বিদেশি শিশু আইনিভাবে নাগরিকত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সম্মেলনে জানানো হয়, ইতালির স্কুলগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে যারা আইনিভাবে ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত। এটি মোট শিক্ষার্থী সংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। এই শিশুদের একটি বিশাল অংশ ইতালিতেই জন্মগ্রহণ করেছে অথবা শৈশবে এখানে এসেছে। তারা ইতালীয় ভাষায় কথা বলে, এদেশের সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠে, অথচ ১৮ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত তারা নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারে না।

শিক্ষার্থীদের প্রতিকূলতা ও বৈষম্য

সম্মেলনে বক্তারা বলেন, নাগরিকত্ব না থাকার কারণে এই শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত নানাবিধ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। স্কুলের শিক্ষা সফরে দেশের বাইরে যাওয়া, প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলায় অংশ নেওয়া কিংবা সরকারি বৃত্তির আবেদনের ক্ষেত্রে তাদের নানা আইনি জটিলতায় পড়তে হয়। বিশেষ করে পড়াশোনা শেষ করে যখন তারা কর্মজীবনে প্রবেশের চেষ্টা করে, তখন অনেক ক্ষেত্রে ইতালীয় পাসপোর্ট না থাকায় তারা সরকারি চাকুরিতে (Concorso) আবেদনের সুযোগ পায় না। এফএলসি সিজিআইএল-এর সাধারণ সম্পাদক জিয়ানা ফ্রাকাসি বলেন, “স্কুল হলো নাগরিকদের তৈরির কারখানা। অথচ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরেই আমরা নাগরিক ও অ-নাগরিকের একটি কৃত্রিম দেয়াল তুলে রেখেছি। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।”

আইন সংস্কারের দাবি ও প্রস্তাবনা

দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে ‘ইয়াস সোলি’ (Ius Soli) বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব এবং ‘ইয়াস স্কোলে’ (Ius Scholae) বা নির্দিষ্ট সময় পড়াশোনা শেষে নাগরিকত্ব দেওয়ার দাবি জানানো হচ্ছে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, কোনো শিশু যদি ইতালিতে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাবর্ষ শেষ করে, তবে তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত। সাম্প্রতিক সময়ে নাগরিকত্ব আইন সংস্কারের পক্ষে ৫ লাখেরও বেশি মানুষের স্বাক্ষর সংগৃহীত হয়েছে, যা একটি গণভোট বা রেফারেন্ডামের পথ প্রশস্ত করেছে। এই প্রস্তাবনায় ১০ বছর ইতালিতে বসবাসের শর্ত কমিয়ে ৫ বছর করার দাবি জানানো হয়েছে।

অভিবাসী ও বাংলাদেশি প্রেক্ষাপট
ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য এই আন্দোলন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইতালিতে কয়েক লাখ বাংলাদেশি বসবাস করেন যাদের সন্তানদের একটি বড় অংশ স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করছে। নাগরিকত্ব আইন সংস্কার হলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কয়েক হাজার শিশু ও কিশোর উপকৃত হবে। বর্তমানে অনেক বাংলাদেশি তরুণ ইতালিতে বেড়ে উঠেও পাসপোর্টের অভাবে ইউরোপের অন্যান্য দেশে কাজের সন্ধানে যেতে বা উচ্চতর সুযোগ নিতে বাধার সম্মুখীন হন।

ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ‘ইতালিয়ানি সেনজা চিত্তাদিনাঞ্জা’ (Italiani senza cittadinanza) বা ‘নাগরিকত্বহীন ইতালীয়’ সংগঠনের প্রতিনিধিরা জানান, এটি কেবল একটি আইনি লড়াই নয়, বরং আত্মপরিচয়ের লড়াই। তারা ইতালির পার্লামেন্টকে এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইতালির বর্তমান জনতাত্ত্বিক কাঠামো ও শ্রমবাজারের প্রয়োজনে এই পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। আগামী মাসগুলোতে এই আন্দোলন আরও বেগবান হতে পারে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

…কিন্তু আমরা তাদের বিদেশী বলি এবং তাদের কোনো নাগরিকত্ব নেই।

flcgil.it

এই দেশে বিশ লক্ষ অভিবাসী সন্তান রয়েছে। তারা ইতালীয় ঢঙে চিন্তা করে ও কথা বলে। তাদের মধ্যে ইতালীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ রয়েছে। তারা এই দেশকে, তাদের নিজেদের দেশকে, পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করতে চায়।

এই কথাগুলো বলেছেন “নাগরিকত্বহীন ইতালীয়” আন্দোলনের সহ-সভাপতি সনি ওলুমাতি , “স্কুল, আন্তঃসংস্কৃতি, সহ-নাগরিকত্ব” উদ্যোগের চূড়ান্ত পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে দেওয়া তাঁর ভাষণে  , যে উদ্যোগটি বাস্তবতা, তার বৈপরীত্য এবং আশাবাদের সচেতনতাকে সফলভাবে একত্রিত করেছে।

আমাদের বুঝতে হবে যে পৃথিবী বদলাচ্ছে, সবকিছু বদলাচ্ছে, এমনকি আমাদের বিশ্বাসও বদলাতে হবে, আমাদের এমন সব জায়গার দিকেও তাকাতে শিখতে হবে যেখানে আমরা তাকাতে অভ্যস্ত নই। দ্বিতীয় প্রজন্ম এই সীমান্তবর্তী বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে। জেনে রাখুন, আমরা ইতালিতে বসবাসকারী বিশ লক্ষ অভিবাসীর সন্তান। বিশ লক্ষ তরুণ-তরুণী, যারা ইতালির পতাকাকে আপন করে নিতে চায়, যারা এই দেশকে, তাদের নিজেদের দেশকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চায়।

চারজন শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনজনই অভিবাসী পরিবারের সন্তান এবং তাদের জন্ম ইতালিতে। তাদের পরিবার “বিদেশী” হলেও, তারা ইতালীয় ভাষায় চিন্তা করে, ইতালীয় ভাষায় যুক্তি দেখায় এবং তাদের মধ্যে ইতালীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ রয়েছে। কিন্তু আমরা তাদের বিদেশী বলি এবং তারা নাগরিকত্বহীন। আমরা এমন একটি আন্দোলন যা এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করে; আমরা নাগরিকত্বহীন ইতালীয়, কিন্তু আমরা ইতালীয়।  

যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ না হই, যদি আমরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত না করি, তবে এই যুদ্ধে জেতার আশা আমরা কীভাবে করি? কারণ এটি একটি যুদ্ধ, মানুষের অমানবিকীকরণের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ।

আসুন আমরা নিজেদেরকে জিজ্ঞাসা করি, আমরা দেশের জন্য কী করতে চাই। সদিচ্ছাই আসল।

TAGGED:
Share This Article