ইতালিতে বছরে মাথাপিছু ৯৮ কেজি খাবার অপচয়: মূল্যস্ফীতির সংকটে উদ্বৃত্ত খাদ্য রক্ষার ডাক

4 Min Read

ইউরোপজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির মাঝেও ইতালির বাসাবাড়িতে বিপুল খাদ্য অপচয় হচ্ছে; আন্তর্জাতিক খাদ্য অপচয় সচেতনতা দিবসে ক্ষুধা নিবারণ ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় সম্মিলিত পদক্ষেপের তাগিদ দিয়েছে খাদ্য সহায়তা সংস্থাগুলো।

তীব্র মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির কারণে সাধারণ পরিবারগুলো যখন মাস শেষে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক তখনই ইতালিতে বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয়ের এক চরম বৈপরীত্যের চিত্র সামনে এসেছে। দেশটিতে একজন নাগরিক বছরে গড়ে প্রায় ৯৮ কেজি খাবার ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দেন। এই সংকটজনক বাস্তবতাকে সামনে রেখেই পালিত হচ্ছে জাতিসংঘের খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি বিষয়ক সপ্তম আন্তর্জাতিক সচেতনতা দিবস (Giornata Internazionale della consapevolezza delle perdite e degli sprechi alimentari)। খাবার অপচয় রোধ করে তা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াকে নিছক ত্রাণ কার্যক্রম নয়, বরং একটি বড় সামাজিক ও পরিবেশগত ন্যায়বিচার হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের (Eurostat) তথ্যানুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নে মাথাপিছু বার্ষিক খাদ্য অপচয়ের গড় যেখানে ১৩০ কেজি, সেখানে ইতালির অপচয়ের পরিমাণ কিছুটা কম হলেও তা মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশটিতে মোট অপচয় হওয়া খাদ্যের অর্ধেকেরও বেশি—অর্থাৎ প্রায় ৫৩ শতাংশই নষ্ট হয় সরাসরি সাধারণ মানুষের বাসাবাড়িতে। বাণিজ্যিক বা উৎপাদন পর্যায়ের চেয়ে গৃহস্থালিতেই খাবার নষ্টের হার বেশি হওয়ায় সমস্যাটিকে বিশেষজ্ঞরা প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের পাশাপাশি গভীরভাবে মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

ইতালির শীর্ষস্থানীয় অলাভজনক খাদ্য সহায়তা সংস্থা ‘বাঙ্কো আলিমেনতারে মার্কে’র (Fondazione Banco Alimentare Marche Ets) সভাপতি রবের্তো দেল বালদো সমাজের এই অসঙ্গতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে তাদের অঞ্চলে নিম্নবিত্ত পরিবারের পাশাপাশি নিঃসঙ্গ বয়োবৃদ্ধ এবং ‘ওয়ার্কিং পুওর’ (working poor)—অর্থাৎ কাজ করেও মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারেন না এমন মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। দেল বালদোর মতে, বাণিজ্যিক চেইন থেকে উদ্বৃত্ত খাবার সংগ্রহ করা কেবল কোনো পরিবহন বা সংরক্ষণ প্রক্রিয়া নয়, এটি সমাজে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের একটি বড় উদ্যোগ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, খাবার অপচয় রুখতে হলে পরিবারের রান্নাঘর থেকেই সচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং খাবারকে কেবল ক্রয়রশিদে লেখা মূল্যের মাপকাঠিতে না দেখে এর মানবিক ও নৈতিক মর্যাদা উপলব্ধি করতে হবে।

এই সংকট নিরসনে দেশটিতে খাদ্য ব্যাংকগুলো কার্যকর ভূমিকা রেখে চলেছে। গেল এক বছরে বাঙ্কো আলিমেনতারে তাদের নেটওয়ার্কভুক্ত ২১টি আঞ্চলিক শাখার মাধ্যমে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা প্রায় ৪৬ হাজার ৮০০ টন উদ্বৃত্ত খাদ্যসামগ্রী সফলভাবে উদ্ধার করেছে। উদ্ধারকৃত এসব খাবার প্রায় ৭ হাজার ৬০০টি আঞ্চলিক সহযোগী সংস্থার (Organizzazioni Partner Territoriali) মাধ্যমে সারা দেশের ১৭ লাখেরও বেশি অসচ্ছল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসটির মূল লক্ষ্যই ছিল অপচয় কমিয়ে খাদ্যের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা। সংশ্লিষ্টদের মতে, খাদ্যের এই বিপুল অপচয় রোধের লড়াইয়ে কোনো পক্ষ এককভাবে জয়ী হতে পারে না। ক্ষুধা ও অপচয়মুক্ত সমাজ গড়তে সরকারি প্রতিষ্ঠান, কৃষিখাত, বৃহৎ সুপারশপ ও সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে একটি টেকসই সামাজিক ঐক্য গড়ে তোলার বিকল্প নেই। প্রতিটি সংরক্ষিত ও অপচয়মুক্ত এক কেজি খাদ্য প্রান্তিক মানুষের জীবনে আশার আলো ও মানবিক মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে সক্ষম।


ইতালিতে বছরে জনপ্রতি গড়ে ৯৮ কেজি খাবার অপচয় হয়; এর ৫৩ শতাংশই ঘটে ঘরে। গত এক বছরে খাদ্য ব্যাংক ৪৬,৮০০ টন খাবার উদ্ধার করে ১৭ লাখ মানুষকে সহায়তা করেছে।

ansa

Share This Article