চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপজুড়ে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন ১৭ শতাংশ হ্রাস পেলেও বাংলাদেশিদের আবেদন বেড়েছে ১৩ শতাংশ; অনুমোদনের হার পাঁচ শতাংশের নিচে থাকায় নতুন কঠোর নীতিমালায় দ্রুত প্রত্যাবাসনের মুখে পড়তে পারেন আবেদনকারীরা।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এর সহযোগী দেশগুলোতে সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত প্রবণতা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অ্যাসাইলাম এজেন্সির (ইইউএএ) প্রকাশিত সর্বশেষ অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপজুড়ে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার মোট আবেদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে সামগ্রিক এই নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যেও শীর্ষ আবেদনকারী দেশগুলোর তালিকায় শক্ত অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, যেখানে আবেদন বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ।
ব্রাসেলস থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত শেনজেনভুক্ত চারটি দেশে (ইইউ প্লাস) সর্বমোট প্রায় ৩ লাখ ৩২ হাজার আশ্রয়ের আবেদন জমা পড়েছে। ২০২১ সালের পর বছরের প্রথম ছয় মাসের হিসাবে এটিই সর্বনিম্ন সংখ্যা। এমনকি করোনাকালীন বৈশ্বিক স্থবিরতার বছরগুলো বাদ দিলে, ২০১৯ সালের পর ইউরোপে আশ্রয়ের আবেদনের এমন ধারাবাহিক পতন আর দেখা যায়নি। মূলত সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং অভিবাসীদের উৎস ও ট্রানজিট দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্যকর যৌথ তৎপরতার কারণেই সামগ্রিক আবেদন কমেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
আবেদনকারীদের জাতীয়তাভিত্তিক পরিসংখ্যানে জানা যায়, শীর্ষ আবেদনকারী দেশ হিসেবে আফগান নাগরিকদের পক্ষ থেকে প্রায় ৩৯ হাজার আবেদন জমা পড়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ৭ শতাংশ কম। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইউরোপে অবস্থানরত আফগান নারীদের পক্ষ থেকে বারবার আবেদন জানানোর যে হিড়িক পড়েছিল, তা কমে আসায় দেশটির আবেদন সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের আবেদনও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে প্রায় ৩৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে, যার ৯৩ শতাংশই জমা পড়েছিল স্পেনে।

বিপরীতে, ইউরোপে আশ্রয়ের আবেদন বাড়ানোর তালিকায় উল্লেখযোগ্য নাম বাংলাদেশ। বছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি নাগরিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। অন্যান্য বৃহৎ আবেদনকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে মিশরীয়দের আবেদন ছিল ১২ হাজার এবং তুর্কি নাগরিকদের ১২ হাজার।
আবেদনের সংখ্যা বাড়লেও বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের আশ্রয় লাভের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ইউরোপজুড়ে প্রথম দফায় সুরক্ষা পাওয়ার সার্বিক গড় হার ছিল ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিনটি আবেদনের একটিতেও সুরক্ষার স্বীকৃতি মেলেনি। এর মধ্যে বাংলাদেশ, মিশর ও ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রথম দফায় অনুমোদনের হার ছিল ৫ শতাংশেরও নিচে। তবে তুর্কি নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই স্বীকৃতির হার ছিল তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি, প্রায় ১৮ শতাংশ।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে গত ১২ জুন ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়া ইউরোপের নতুন আশ্রয় বিধিমালা। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশের নাগরিকদের বিগত বছরের গড় স্বীকৃতির হার যদি ২০ শতাংশের নিচে হয়, তবে তাদের ক্ষেত্রে দ্রুতগতির যাচাই এবং সীমান্তেই নিষ্পত্তির বিশেষ প্রক্রিয়া (অ্যাক্সিলারেটেড অ্যান্ড বর্ডার প্রসিডিউর) প্রয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া ইউরোপের বিবেচনায় ‘নিরাপদ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের ওপরও এই নিয়ম প্রযোজ্য। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের মোট আবেদনের প্রায় ৫৬ শতাংশই এই কঠোর নিয়মের আওতায় পড়েছে। স্বীকৃতির হার ৫ শতাংশের নিচে থাকায় ইউরোপে আশ্রয়প্রত্যাশী বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক এই কঠোর সীমান্ত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন, যার ফলে আবেদন দ্রুত বাতিল হয়ে সরাসরি দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপে অ্যাসাইলাম আবেদন ১৭% কমে ৩ লাখ ৩২ হাজার হলেও বাংলাদেশিদের আবেদন ১৩% বেড়ে প্রায় ২০ হাজারে পৌঁছেছে।
ansa


