ইউরোপে পৌঁছানোর ঝুঁকিপূর্ণ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গাড়ির গোপন প্রকোষ্ঠে লুকিয়ে থাকা এক তিউনিসিয়ান অভিবাসীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে; এ ঘটনায় অবৈধ অভিবাসনে সহায়তার অভিযোগে ফ্লোরেন্সে অধ্যয়নরত এক শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে ইতালির পুলিশ।
তিউনিসিয়া থেকে ইতালির সিসিলি দ্বীপের পালের্মোগামী একটি যাত্রীবাহী ফেরিতে থাকা প্রাইভেটকারের ভেতর থেকে আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী এক তরুণের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সমুদ্রপথে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশের উদ্দেশ্যে ওই তরুণ গাড়িটির পেছনের অংশে বিশেষভাবে তৈরি একটি লুকানো প্রকোষ্ঠে আত্মগোপন করেছিলেন। তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই গাড়ির ভেতরেই তাঁর মৃত্যু হয়। গত ৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ইতালির গণমাধ্যমে এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর প্রকাশ করা হয়।
ইতালির পুলিশ ও তদন্তকারী সূত্রের বরাতে দেশটির শীর্ষ দৈনিক ‘কোরিয়েরে দেল্লা সেরা’ (Corriere della Sera) জানায়, নিহত তরুণ তিউনিসিয়ার নাগরিক হলেও তাঁর কাছে কোনো ধরনের বৈধ পরিচয়পত্র বা ভ্রমণ সংক্রান্ত নথি পাওয়া যায়নি। মূলত সীমান্ত পুলিশের তল্লাশি এড়াতেই তিনি তিউনিসিয়া থেকে ছেড়ে আসা ফেরিতে তোলা ‘অডি এ-সিক্স’ (Audi A6) মডেলের একটি গাড়ির ভেতর লুকিয়ে ছিলেন।
গাড়িটির চালক ও মালিক ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে অধ্যয়নরত তিউনিসিয়ার এক তরুণী, যিনি সেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন। সমুদ্রযাত্রার একপর্যায়ে গাড়ির পেছনের অংশে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তির কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং তাৎক্ষণিকভাবে ফেরির কর্মীদের বিষয়টি জানান। ফেরিটি সিসিলির পালের্মো বন্দরে পৌঁছানোর পর পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে যুবকের নিথর দেহ উদ্ধার করে। পূর্বে কোনো অপরাধের রেকর্ড না থাকা সত্ত্বেও অবৈধ অভিবাসনে প্রত্যক্ষ সহায়তার অভিযোগে ওই নারী শিক্ষার্থীকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়।

স্থানীয় সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয় থেকে নিহতের মৃত্যুর সঠিক কারণ ও সময় নির্ধারণের জন্য মরদেহের ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এটি কোনো সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রের সুপরিকল্পিত কাজ, নাকি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা—তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। যাত্রার গতিপথ পুনর্নির্মাণ এবং এতে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না তা নিশ্চিত করতে নিহত যুবক ও গাড়ির চালক উভয়ের মোবাইল ফোন জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।
সমুদ্রগামী ফেরিতে লুকিয়ে ইতালি প্রবেশের চেষ্টাকালে প্রাণহানির ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগে ২০২৪ সালেও তিউনিসিয়ার লা গুলেত বন্দর থেকে পালের্মোগামী ‘স্প্লেনডিড’ (Splendid) নামের একটি জাহাজে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় এক তিউনিসিয়ান অভিবাসী বন্দর কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিতে একটি ট্রাকের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ফেরি থেকে গাড়ি নামানোর সময় তিনি সেই ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান।
উন্নত জীবনের সন্ধানে থাকা হাজার হাজার অভিবাসীর কাছে ইতালি এখনও ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। তিউনিসিয়া উপকূল থেকে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপের দূরত্ব মাত্র একশ কিলোমিটারের কিছু বেশি হওয়ায় এই বিপজ্জনক সমুদ্রপথটি অভিবাসনপ্রত্যাশীরা নিয়মিত ব্যবহার করেন। তবে সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, দেশটিতে সমুদ্রপথে অনুপ্রবেশের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২১ হাজার অভিবাসী ইতালিতে পৌঁছেছেন, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের ৪৭ হাজারের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। এছাড়া পুরো ২০২৫ সালে প্রায় ৬৬ হাজার মানুষ অবৈধ পথে দেশটিতে প্রবেশ করেছিলেন।
তিউনিস থেকে পালার্মোগামী ফেরিতে গাড়ির ভেতর লুকিয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করা ২৫ বছর বয়সী এক তিউনিসীয় অভিবাসীর মরদেহ উদ্ধার; ঘটনার তদন্তে মানবপাচার চক্রের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ।
romatoday


