ইতালিতে ১৯৭ বিলিয়ন ইউরোর গোপন অর্থনীতি: কর ফাঁকিতে নাগরিকপ্রতি ক্ষতি সাড়ে ৩ হাজার ইউরো

4 Min Read

গবেষণা সংস্থা সেনসিস ও কনফকোপারেটিভের যৌথ প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে দেশটির জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশই কালো অর্থনীতির দখলে; চরম আর্থিক শোষণের শিকার হচ্ছেন প্রায় ২৭ লাখ অনিয়মিত শ্রমিক।

ইতালির জাতীয় অর্থনীতিতে কালো টাকার বিস্তার ও কর ফাঁকির প্রবণতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেনসিস’ (Censis) এবং সমবায় সমিতিগুলোর শীর্ষ সংগঠন ‘কনফকোপারেটিভ’ (Confcooperative)-এর যৌথ এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশটিতে তথাকথিত ‘অদৃশ্য’ বা ছায়া অর্থনীতির (economia sommersa) মোট আর্থিক আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরোতে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ইতালির সামগ্রিক মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) প্রায় ৯ দশমিক ২ শতাংশের সমান। রাজস্ব ফাঁকির এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে নবজাতক থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ—প্রত্যেক ইতালীয় নাগরিকের অধিকার থেকে গড়ে বছরে প্রায় ৩ হাজার ৩৫০ ইউরো হারিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে উঠে আসা এই বিশাল অঙ্কের ক্ষতির পরিধি তুলে ধরে বলা হয়েছে, এটি অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ অঞ্চল এমিলিয়া-রোমানিয়ার (Emilia-Romagna) পুরো এক বছরের মোট উৎপাদনের সমান। শুধু তা-ই নয়, এই লুকানো অর্থ দিয়ে ইতালির জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা খাতের (National Health Service) পুরো এক বছরের যাবতীয় সরকারি ব্যয় অনায়াসে মেটানো সম্ভব, যা বার্ষিক প্রায় ১৪২ বিলিয়ন ইউরো। তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে প্রত্যক্ষ কর ও সামাজিক সুরক্ষা অবদান বাবদ বছরে ১০০ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।

কনফকোপারেটিভের সভাপতি মাউরিজিও গার্দিনি (Maurizio Gardini) এই অঘোষিত অর্থনীতিকে ইতালির বিদ্যমান সরকারি ঋণের ওপর ‘এক বিশাল পাথর বা বোঝা’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ছায়া অর্থনীতি এমন এক বাস্তবতা যা সাধারণ চোখে দেখা যায় না এবং যার ওপর কোনো রাষ্ট্রীয় করও আদায় হয় না। এই আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি এর পেছনে থাকা মানবিক সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, প্রায় ২৭ লাখ অনিয়মিত শ্রমিক এই কাঠামোর মধ্যে চরম শোষণের শিকার হচ্ছেন। এসব শ্রমিক বৈধ বা নিয়মিত কর্মীদের তুলনায় প্রায় অর্ধেক পারিশ্রমিকে অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রতিবেদনের বিশদ বিশ্লেষণে ইতালির এই অদৃশ্য অর্থনীতির পেছনে মূলত তিনটি প্রধান চালিকাশক্তি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি আসছে প্রকৃত আয়ের ভুল বা কম তথ্য প্রদর্শন (sottodichiarazione) থেকে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন খাতের পেশাজীবী এবং স্বাধীন বা স্বনির্ভর কর্মীরা প্রকৃত উপার্জনের চেয়ে কম আয় দেখিয়ে উৎপাদন শুল্ক, আয়কর এবং মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট (IVA) ফাঁকি দিচ্ছেন। এই একক খাত থেকেই ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে প্রায় ১০৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরো, যা ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় ২১ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হিসেবে রয়েছে অনিবন্ধিত বা আংশিক ঘোষিত কর্মসংস্থান (lavoro irregolare)। এই অবৈধ শ্রমবাজার থেকে অর্থনীতিতে অপ্রদর্শিত থেকে যাচ্ছে প্রায় ৭৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরো, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৪ শতাংশ বেড়েছে। এ ছাড়া বাড়িভাড়ার গোপন চুক্তি (affitti in nero) এবং হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ব্যক্তিগত সেবা খাতের অঘোষিত বকশিশ থেকে ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে আরও প্রায় ১২ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরো। সার্বিক পর্যবেক্ষণে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ইতালির কালো অর্থনীতির পরিধি বৃদ্ধির পেছনে কেবল অবৈধ শ্রম নয়, বরং নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ও স্বাধীন পেশাজীবীদের আয় গোপন করার প্রবণতাই বর্তমানে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।


ইতালির ছায়া অর্থনীতি ১৯৭.৬ বিলিয়ন ইউরো, যা জিডিপির ৯.২%; অনিয়মিত ২.৭ মিলিয়ন কর্মী ও কর ফাঁকির কারণে প্রত্যেক নাগরিকের সম্ভাব্য ক্ষতি ৩,৩৫০ ইউরো।

ansa

Share This Article