সিসিলির পালেরমোতে সকালে লন্ড্রিতে ইন্টার্নশিপ এবং বিকেলে হোটেল ম্যানেজমেন্টের ক্লাসে অংশ নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ছেন ১৮ বছর বয়সী ওই প্রবাসী; লক্ষ্য স্বাবলম্বী হয়ে মাকে ইতালি নিয়ে আসা।
আন্তর্জাতিক স্বপ্ন দিবসে (Giornata internazionale dei sogni) ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ সিসিলির পালেরমো শহরে সামনে এসেছে এক বাংলাদেশি তরুণীর অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প। মাত্র আঠারো বছর বয়সে পড়ালেখা ও কর্মজীবনের মধ্যে চমৎকার ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন মাইশা নামের এই প্রবাসী শিক্ষার্থী। বড় হয়ে পর্যটন শিল্পের শীর্ষ কর্মকর্তা বা হোটেল ম্যানেজার (Hotel Manager) হিসেবে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যারিয়ার গড়াই তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য। স্থানীয় একটি সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি এখন সমানতালে পড়াশোনা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছেন।
মাইশার বর্তমান দৈনন্দিন রুটিন প্রচণ্ড ব্যস্ততায় ভরা কিন্তু একই সাথে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমুখী। প্রতিদিন সকালবেলা তিনি কাজ করেন ‘আলত্রোভারসো’ (AltroVerso) নামের একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক লন্ড্রিতে ইন্টার্ন হিসেবে, আর বিকেল হতেই নিয়মিত ক্লাসে অংশ নিতে চলে যান আতিথেয়তা ও হোটেল ব্যবস্থাপনা বিষয়ক উচ্চবিদ্যালয় ‘ইস্তিতুতো আলবেরগিয়েরো’তে (Istituto Alberghiero)। মাত্র এক বছর আগে বাবা এবং বোন সুমাইয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে পাড়ি জমিয়েছিলেন পালেরমোর বোর্গো ভেক্কিও (Borgo Vecchio) এলাকায়। ইতালিতে পৌঁছানোর পর থেকেই প্রতিকূলতা জয় করে মূলধারার সমাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা শুরু করেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় গত জুন মাসে প্রাপ্তবয়স্কদের বিশেষ শিক্ষাকেন্দ্র চেপিয়া (CPIA) থেকে নিম্নমাধ্যমিকের ডিপ্লোমা (licenza media) সম্পন্ন করেন এবং এরপরই সরাসরি কর্মমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

মাইশার এই স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে স্থানীয় সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা ‘পের এজেম্পিও’ (Per Esempio)। দেশটির অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক ইন্তেসা সানপাওলোর (Intesa Sanpaolo) চ্যারিটি ফান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত ‘ফেমিনিনলে প্লুরালে’ (Femminile Plurale) প্রকল্পের কর্মশালার মাধ্যমে সংস্থাটির কর্মীরা মাইশার সন্ধান পান। প্রকল্পের সমন্বয়ক জুলিয়া মানজেল্লা (Giulia Manzella) জানান, শুরুতে মাইশার ইতালীয় ভাষায় কিছুটা জড়তা এবং স্বভাবজাত লজ্জা থাকলেও তাঁর দ্রুত শেখার ক্ষমতা ও যেকোনো নতুন কাজের মুখোমুখি হওয়ার সাহসিকতা সবার নজর কাড়ে। সংস্থাটি মাইশাকে কেবল চাকরির প্রশিক্ষণই দেয়নি, বরং সমাজে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, গণপরিবহন ব্যবহার ও স্থানীয় নাগরিক সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মতো প্রতিটি ধাপে কার্যকর সহায়তা দিয়েছে।
সংস্থাটির সহায়তায় গত জুলাই মাসে লন্ড্রি ও পর্যটন সেবা প্রতিষ্ঠান আলত্রোভারসোতে মাইশার ব্যবহারিক কাজের হাতেখড়ি হয়। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম অংশীদার ও প্রশাসক এর্নেস্তো পাচি (Ernesto Paci) জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের মূল নীতি হলো ‘ভিন্নভাবে স্বাগত জানানো’ (welcome differently)। এর আওতায় তারা কেবল বাণিজ্যিক সেবা দেওয়াই নয়, বরং সুবিধাবঞ্চিত তরুণীদের সমাজে আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচার সুযোগ তৈরি করে দেন। কর্মক্ষেত্রে সবার আন্তরিক সহযোগিতা ও নিরাপদ পরিবেশে মাইশাও নিজেকে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে মানিয়ে নিয়েছেন।
ইতালির আধুনিক সমাজব্যবস্থায় নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সমঅধিকার মাইশাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর মতে, পুরুষ ও নারীদের সমান সুযোগ এবং সমাজে মেয়েদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তাঁর কাজের গতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। শহর হিসেবে পালেরমোর সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় খাবার—বিশেষ করে টুনা ও পেঁয়াজের পিৎজা তাঁর অত্যন্ত পছন্দের। তবে এত অর্জনের মধ্যেও তাঁর মনে একটি বড় আক্ষেপ রয়ে গেছে; আর তা হলো বাংলাদেশে একা থাকা তাঁর মা। ফ্যামিলি রিইউনিয়ন বা পারিবারিক পুনর্মিলন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থে খুব দ্রুত মাকে ইতালিতে নিজের কাছে নিয়ে আসাই এখন মাইশার প্রধান সংকল্প। আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি বিশ্বাস করেন, সঠিক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম অব্যাহত রাখলে একদিন কোনো আন্তর্জাতিক হোটেলের শীর্ষ পদে দাঁড়িয়ে তিনি সগৌরবে নিজের স্বপ্ন পূরণের ঘোষণা দিতে পারবেন।
পালার্মোতে ১৮ বছর বয়সী বাংলাদেশি তরুণী মাইশা পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরির প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগোচ্ছেন; ভবিষ্যতে তার লক্ষ্য একজন হোটেল ম্যানেজার হওয়া এবং মাকে ইতালিতে আনা।
ilmediterraneo24


