নতুন শিক্ষাবর্ষের সূচনালগ্নে স্কুল সংস্কার, আবাসন সংকট সমাধান এবং যুদ্ধবিরোধী দাবিতে মিলানের রাজপথ প্রদক্ষিণ; বিকেলে বৈশ্বিক জলবায়ু আন্দোলনে সংহতির ডাক।
ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় শিল্পনগরী মিলানে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সরকারি বিভিন্ন শিক্ষানীতির প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। শ্রেণিকক্ষে বিদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীদের ওপর সর্বোচ্চ কোটা নির্ধারণ এবং শিক্ষাখাতে বাজেট কমানোর সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আয়োজিত এই বিশাল পদযাত্রা শেষ পর্যন্ত স্থানীয় পলিক্লিনিকো হাসপাতালের একটি পরিত্যক্ত সাবেক মর্গ ভবন সাময়িকভাবে দখলের মধ্য দিয়ে তীব্র রূপ নেয়। দেশব্যাপী জাতীয় স্কুল ধর্মঘটের অংশ হিসেবে মিলানের রাজপথে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সকালে মিলানের প্রাণকেন্দ্র লারগো কায়রোলি (Largo Cairoli) চত্বরে জড়ো হয়ে শিক্ষার্থীরা একটি বিশাল ও বর্ণাঢ্য মিছিল বের করেন। মিছিলটি পুরো শহরের কেন্দ্রস্থল প্রদক্ষিণ করে। এ সময় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রধান স্লোগান ছিল ‘কেউ বিদেশি নয়’ (Nessuno è straniero)। মেলোনি সরকারের শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক পর্যায়ের শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সীমা ৩০ শতাংশে বেঁধে দেওয়ার উদ্যোগের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান তারা। শিক্ষার্থীদের মতে, অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের ওপর দায় না চাপিয়ে সরকারের উচিত শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অবহেলা ও প্রকৃত সংকট সমাধানের দিকে নজর দেওয়া।
বিক্ষোভ চলাকালে আন্দোলনকারীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, বহু সরকারি স্কুলে ছাদের পলেস্তারা ও টাইলস খসে পড়ছে, অথচ সংস্কারকাজে কোনো সরকারি বরাদ্দ নেই। এর পাশাপাশি মিলানের ক্রমবর্ধমান আবাসন সংকট ও উচ্চ বাড়িভাড়ার (Caro affitti) বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, মিলানজুড়ে বহু খালি ও অব্যবহৃত সরকারি-বেসরকারি ভবন পড়ে রয়েছে; এগুলো ফেলে না রেখে দ্রুত সংস্কার করে সাধারণ তরুণ ও শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দাবির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন একটি স্পষ্ট যুদ্ধবিরোধী ও রাজনৈতিক মাত্রাও লাভ করে। শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইউরোপীয় পুনঃঅস্ত্রায়ন (Riarmo) কর্মসূচির তীব্র বিরোধিতা করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেত্রী এলি শ্লেইনের ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড বহন করা হয়, যেখানে প্রতীকী রক্তাক্ত হাতের ছাপ এঁকে যুদ্ধনীতির নিন্দা জানানো হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, অস্ত্রের পেছনে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় না করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নাগরিক কল্যাণে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের এই বিশাল পদযাত্রা এবং রাস্তা অবরোধের ফলে মিলানের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। শহরের বেশ কিছু প্রধান সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং সিটি বাস ও ট্রামসহ গণপরিবহনের গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের সাবেক মর্গ ভবনের ভেতরে প্রতীকী অবস্থান সন্ধ্যা নাগাদ শেষ করার কথা জানান আন্দোলনকারীরা। একই সাথে বিকেলে সান বাবিলা (Piazza San Babila) চত্বরে আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন ফ্রাইডেস ফর ফিউচারের (Fridays for Future) জলবায়ু ধর্মঘটেও দলবদ্ধভাবে সংহতি প্রকাশ করে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন তারা।
মিলান ও লোম্বার্দিয়া অঞ্চলে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারের জন্য শিক্ষার্থীদের এই কোটাবিরোধী আন্দোলন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করার নীতি কার্যকর হলে অভিবাসী পরিবারের শিশুদের ভর্তি হওয়া নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এই বাস্তবতায় স্থানীয় ইতালীয় ও অভিবাসী শিক্ষার্থীদের এমন ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রবাসী কমিউনিটির মধ্যেও ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মিলানে হাজারো শিক্ষার্থীর বিক্ষোভে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ৩০% সীমার বিরোধিতা, স্কুলে বরাদ্দ কমানো ও শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটের প্রতিবাদও উঠে এসেছে।
Tgr


