মিলানে সহিংসতা ও লুটপাটের নেপথ্যে সোশ্যাল মিডিয়া: ক্লাসরুম থেকে ১১ বছরের শিশু আটক, ৫০০ তরুণের খোঁজে পুলিশ

4 Min Read

‘আমরা ভাঙব, তোমরা লুট করো’ টিকটক ও টেলিগ্রামে এমন বার্তা ছড়িয়ে তরুণদের কেন্দ্রে জড়ো করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা; অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে নাশকতা সৃষ্টির চক্রান্তের অভিযোগ।

ইতালির মিলান শহরে সপ্তাহান্তে ঘটে যাওয়া ব্যাপক ভাঙচুর, সহিংসতা ও দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনায় এগারো বছর বয়সী এক স্কুলশিক্ষার্থীকে শনাক্ত ও আটক করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। স্থানীয় মিডল স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষে (Seconda media) পড়ুয়া ওই ইতালীয় শিশুকে তার ক্লাসরুম থেকেই আটক করে কারাবিনিয়ারি পুলিশ। আটকের সময় শিশুটির পরনে লুটপাট করা চোরাই পোশাক ছিল। মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সে ভাঙচুর হওয়া একটি দোকান থেকে একগাদা ব্র্যান্ডের বেল্ট হাতে নিয়ে বের হয়ে আসছে। এই চাঞ্চল্যকর আটকের ঘটনার পর তাণ্ডব ও লুটপাটে জড়িত বাকি প্রায় পাঁচ শতাধিক তরুণকে চিহ্নিত করতে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সুপরিকল্পিত চক্রান্তের অংশ হিসেবেই কিশোর-তরুণদের এই ধ্বংসযজ্ঞে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাথমিক আইনি পদক্ষেপ অনুমোদনকারী বিচারক ধারণা করছেন, চরম সামাজিক ক্ষোভ ও হতাশায় ভোগা অতি অল্প বয়সী কিশোরদের সামনে রেখে বিক্ষোভকে সহিংসতায় রূপ দেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ছক কাজ করেছে। এই নাশকতার মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করতে তদন্তকারীরা বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দুটি আলোচিত প্রোফাইলের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছেন। এর একটি হলো ‘ইতালিয়া ইন পিয়াতসা’, যে অ্যাকাউন্ট থেকে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির (কারোভিতা) বিরুদ্ধে রাজপথে নামার ডাক দেওয়া হয়েছিল। অন্যটি হলো ‘মুভিমেন্তো ১৭ অক্তোবরে’, যারা নিজেদের কোনো সুনির্দিষ্ট নেতৃত্ব বা মতাদর্শবিহীন উন্মুক্ত আন্দোলন হিসেবে দাবি করে।

আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারীদের সামনে অত্যন্ত চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। মিলানের শহরতলি এবং আশেপাশের বিভিন্ন শহর থেকে আসা তরুণরা স্বীকার করেছে, রবিবার সন্ধ্যায় তাদের টিকটক ও টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে একটি বার্তা পাঠিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলে জড়ো হতে বলা হয়। ওই প্ররোচনামূলক বার্তায় সরাসরি বলা হয়েছিল ‘আমরা ভাঙচুর চালাব, তোমরা গিয়ে জামা-জুতো নিয়ে নাও’ (Noi spacchiamo, voi prendete felpe e scarpe)। এই ধরণের লোভনীয় বার্তার ফাঁদে পা দিয়ে শত শত অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়াই মূলত দামি পোশাক ও জুতো লুটের নেশায় কেন্দ্রস্থলে গিয়ে সহিংসতায় অংশ নেয়।

এদিকে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার দায়ে আটক প্রায় ৪০ জন অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, এর আগে গৃহবন্দী থাকা ২১ বছর বয়সী এক তরুণকে নিয়মিত থানায় হাজিরার শর্তে (Obbligo di firma) মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এর আগের দিন পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্ক আসামির গ্রেপ্তার আদেশ বহাল রাখেন বিচারক। অন্যদিকে সহিংসতায় সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিযোগে আটক ১১ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরকে বিভিন্ন কিশোর পুনর্বাসন কেন্দ্র (Comunità) অথবা কঠোর নজরদারিতে নিজ বাড়িতে গৃহবন্দী (Domiciliari) রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শহরের কেন্দ্রস্থলে এমন তাণ্ডব ও লুটপাটের ঘটনায় মিলানের সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ী মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চ্যাট ও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। নাশকতায় অংশ নেওয়া অবশিষ্ট পাঁচ শতাধিক তরুণের প্রত্যেককে দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

মিলানের সহিংসতায় শনাক্তদের মধ্যে ১১ বছরের এক শিশুও রয়েছে; তদন্তকারীরা লুটপাট ও ভাঙচুরে জড়িত প্রায় ৫০০ তরুণকে শনাক্ত করতে তদন্ত চালাচ্ছেন।

Tgr

Share This Article