সেউতা ও ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে ক্রমবর্ধমান অভিবাসন চাপ: ইইউ নীতি মেনে আইন সংস্কারের পথে স্পেন

4 Min Read

মরক্কো সীমান্ত দিয়ে নজিরবিহীন গণঅনুপ্রবেশের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সামাল দিতে নিজেদের অভিবাসন ও রাজনৈতিক আশ্রয় সংক্রান্ত আইন আমূল সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাদ্রিদ। মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

স্পেনের উত্তর আফ্রিকা উপকূলীয় ছিটমহল সেউতায় (Ceuta) চলমান দীর্ঘমেয়াদী অভিবাসন সংকট নিরসনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। গত জুলাই মাসে মরক্কো সীমান্ত দিয়ে রেকর্ড সংখ্যক মানুষের অবৈধ প্রবেশের ঘটনায় সৃষ্ট অস্থিরতা কাটাতে বিদ্যমান অভিবাসন ও রাজনৈতিক আশ্রয় সংক্রান্ত আইন সংস্কারের একটি খসড়া বিল চূড়ান্ত করেছে মাদ্রিদ। গত মঙ্গলবার অনুমোদিত এই বিলটির মূল লক্ষ্য হলো ‘স্প্যানিশ আইনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম প্যাক-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা’, যা চলতি গ্রীষ্মে পুরো ইউরোপজুড়ে কার্যকর হয়েছে।

সংকটের পটভূমি ও বর্তমান পরিস্থিতি

গত জুলাই মাসে মাত্র একদিনের ব্যবধানে মরক্কো সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করলে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যদিও তাদের একটি বড় অংশকে তাৎক্ষণিকভাবে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছে, তবুও বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার অভিবাসী এই ছিটমহলে আটকা পড়ে আছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এদের মধ্যে প্রায় ২ হাজার জনই অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক বা শিশু। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের আবাসন ও আইনি সুরক্ষার বিষয়টি সামলাতে গিয়ে সেউতার স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

আইনি সংস্কার ও নতুন পদক্ষেপ

প্রস্তাবিত নতুন আইনটি কেবল সেউতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি আটলান্টিক মহাসাগরের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জেও (Canary Islands) কার্যকর হবে, যেখানে ইদানীং নৌকাযোগে অবৈধ অভিবাসীদের আগমনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নতুন এই আইনের আওতায় ইইউ-এর বিশেষ ‘স্ক্রিনিং’ বা পরিচয় যাচাইকরণ প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করা হবে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্পেন সরকার সেউতা সংকটকে সরাসরি ‘জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি ‘একক কমান্ড’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছে।

রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও শিশুদের সুরক্ষা

আটকে পড়া শিশুদের স্পেনের মূল ভূখণ্ডে স্থানান্তর করার প্রচেষ্টা বর্তমানে বড় ধরনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও মানবিক কারণে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার, রক্ষণশীল বিরোধী দল ‘পিপলস পার্টি’ এবং সেউতার আঞ্চলিক সরকারের মধ্যে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে যে, যাদের ইইউ ভূখণ্ডে থাকার কোনো আইনি ভিত্তি নেই, তাদের অবশ্যই ফেরত পাঠাতে হবে। তবে শিশুদের অধিকার সুনিশ্চিত করার বিষয়ে মাদ্রিদ এখনও কোনো কার্যকর সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি।

পারস্পরিক দোষারোপ ও গুজব

একদিনেই কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিল, সে বিষয়ে মাদ্রিদ মানবপাচারকারী চক্র এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গুজবকে দায়ী করেছে। গুজব ছড়ানো হয়েছিল যে, সেউতায় ঢুকলেই অভিবাসীরা স্বয়ংক্রিয়াভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে যাবেন। অন্যদিকে, মরক্কোর রাজধানী রাবাত দাবি করেছে যে, চলতি বছরের শুরুর দিকে স্পেন সরকার বিপুল সংখ্যক অভিবাসীকে ঢালাওভাবে বৈধতা দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটিই মূলত অবৈধ অভিবাসীদের কাছে একটি ভুল বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ গত জুলাইয়ের শেষে সেউতা পরিদর্শন করে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার অঙ্গীকার করলেও এখন পর্যন্ত এই সংকট নিয়ে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা দেননি। তবে সেউতার আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট হুয়ান ভিভাস কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের আকুতি জানিয়ে আসছেন, কারণ শহরটির আশ্রয় দেওয়ার সমস্ত ক্ষমতা এখন ধ্বংসের মুখে। এই নতুন আইনি সংস্কার স্পেনের অভিবাসন সংকটে কতটা কার্যকর পরিবর্তন আনে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

সেউতা সংকটের পর স্পেন অভিবাসন ও রাজনৈতিক আশ্রয় আইন সংস্কার করছে, যাতে নতুন ইইউ মাইগ্রেশন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা যায়।

noticiasbangla

Share This Article