ইতালিতে প্রবাসীদের সরকারি আবাসন সুবিধা: কাজের বাধ্যবাধকতা নিয়ে ইউরোপীয় আদালতের দ্বারস্থ সাংবিধানিক আদালত

4 Min Read

অ-ইউরোপীয় নাগরিকদের সামাজিক আবাসন পাওয়ার ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান থাকার পূর্বশর্ত ইইউ বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইতালির সর্বোচ্চ আদালত; চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দিন গুনছেন অভিবাসীরা।

ইতালিতে অ-ইউরোপীয় অভিবাসীদের জন্য সরকারি ভর্তুকিপ্রাপ্ত আবাসন বা ‘কাসে পোপোলারি’ (Case popolari) বরাদ্দের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের বাধ্যবাধকতা রাখার আইনি বৈধতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। স্থানীয় আইনের এই বৈষম্যমূলক শর্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সমানাধিকার নীতির পরিপন্থী কি না, তা স্পষ্ট করতে বিষয়টি লুক্সেমবার্গে অবস্থিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিচার আদালতের (Corte di giustizia dell’Unione europea) কাছে পাঠানো হয়েছে। ইতালির সাংবিধানিক আদালত (Corte costituzionale) ১৭৫ নম্বর অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই বিষয়টির প্রাথমিক নিষ্পত্তির জন্য ইইউ আদালতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানিয়েছে।

বর্তমানে ইতালির প্রচলিত আইন অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের কোনো দেশের নাগরিককে সরকারি বাসস্থানের আবেদন করতে হলে তাঁর নিয়মিত কর্মসংস্থান থাকা বাধ্যতামূলক। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘একক পারমিট’ (Single Permit) সংক্রান্ত বিধিমালার সঙ্গে এই নিয়মের স্পষ্ট সাংঘর্ষিকতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাংবিধানিক আদালত ইউরোপীয় আদালতের কাছে জানতে চেয়েছে, সামাজিক আবাসনে সমান সুযোগের অধিকার শুধু চাকরিজীবীদের মধ্যে সীমিত রাখার এই বিধিনিষেধটি জাতীয় আইনে স্পষ্টভাবে ও সরাসরি লিখিত থাকা আবশ্যক কি না; নাকি আইন প্রণয়নের সময়কার প্রস্তুতিমূলক নথি বা নীতিগত নথিপত্রে এর স্পষ্ট উল্লেখ থাকাই যথেষ্ট।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০১১/৯৮ নির্দেশিকা এবং পরবর্তী সময়ে তা প্রতিস্থাপনকারী ২০২৪/১২৩৩ নির্দেশিকার ১২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যেসব অভিবাসী কর্মী একক পারমিটধারী, তাঁরা সংশ্লিষ্ট সদস্য রাষ্ট্রে বাসস্থান প্রাপ্তির প্রক্রিয়াসহ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত সব ধরনের সুযোগ-সুবিধায় স্থানীয় নাগরিকদের মতোই সমান অধিকার ভোগ করবেন। তবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে কিছুটা ছাড় দিয়ে নির্দেশিকাটিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, কোনো রাষ্ট্র চাইলে এই সমান সুবিধার বিষয়টি কেবল নিয়মিত কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যে সীমিত রাখতে পারে। অন্যদিকে, ইতালির অভিবাসন আইনের (আইনি ডিক্রি ২৮৬/৯৮) ৪০ অনুচ্ছেদের ৬ উপধারা অনুসারে, সরকারি আবাসিক সুবিধা এবং সহজ শর্তে বাড়ি কেনার সামাজিক ঋণ পাওয়ার জন্য বিদেশিদের দীর্ঘমেয়াদি স্টে পারমিট বা ন্যূনতম দুই বছর মেয়াদি রেসিডেন্স পারমিটের পাশাপাশি নিয়মিত চাকরি বা নিজস্ব বৈধ পেশায় নিয়োজিত থাকা আবশ্যিক করা হয়েছে। জাতীয় আইনের এই পূর্বশর্তই এখন তীব্র আইনি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এই জটিল আইনি বিতর্কের সূত্রপাত হয় উত্তরাঞ্চলীয় শহর তোরিনোর ট্রাইব্যুনালে (Tribunale di Torino)। আদালতটির ২০২৬ সালের ২৩ নম্বর আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি চূড়ান্ত ব্যাখ্যার জন্য সাংবিধানিক আদালতে পৌঁছায়। সাংবিধানিক আদালত মনে করছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৌলিক নীতিমালার সঙ্গে জড়িত এই আইনি জটিলতা ইউরোপীয় আদালতের নির্দেশনা ছাড়া নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। ফলে ইইউ বিচার আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তোরিনো আদালতের বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইউরোপীয় আদালতের এই পদক্ষেপের দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখছেন ইতালিতে বসবাসরত হাজার হাজার অভিবাসী, বিশেষ করে বিশালসংখ্যক বাংলাদেশি পরিবার ও শ্রমিকেরা। ইতালির বড় বড় শহরগুলোতে আকাশচুম্বী বাড়িভাড়ার কারণে নিম্ন আয়ের প্রবাসীদের কাছে সরকারি ভর্তুকিপ্রাপ্ত আবাসন অন্যতম প্রধান একটি সামাজিক সুরক্ষা। কোনো কারণে সাময়িক কর্মহীন হয়ে পড়া কিংবা অনিয়মিত আয়ের কারণে অনেক সময় অভিবাসীরা এই আবাসন সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। যদি ইউরোপীয় আদালত ইতালির বর্তমান এই শর্তকে বৈষম্যমূলক ঘোষণা করে, তবে চাকরিহীন কিন্তু নিয়মিতভাবে বসবাসকারী বহু প্রবাসী পরিবারের জন্য সামাজিক বাসস্থানের আবেদনের পথ উন্মুক্ত হবে।

ইতালিতে সরকারি আবাসন পেতে কর্মরত থাকার শর্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈষম্যহীন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাইয়ে সাংবিধানিক আদালত মামলাটি ইউরোপীয় বিচার আদালতে পাঠিয়েছে।

integrazionemigranti.gov

Share This Article