ইতালিতে স্ত্রীর হামলায় অঙ্গহানির শিকার বাংলাদেশির প্রতিবন্ধী ভাতার প্রত্যাখ্যান

5 Min Read

নৃশংস নির্যাতনের শিকার মিজানুর রহমানকে ৬৭ শতাংশ অক্ষম বলে ঘোষণা করেছে ইনপস (INPS), যা সরকারি ভাতার জন্য অপর্যাপ্ত; এই সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ দাবি করে পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

ইতালির সালের্নো (Salerno) প্রদেশের আংগ্রি (Angri) এলাকায় এক রোমহর্ষক পারিবারিক সহিংসতার শিকার ৪১ বছর বয়সী মিজানুর রহমান এখন এক নতুন আইনি যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছেন। নিজ স্ত্রীর হাতে নৃশংসভাবে অঙ্গহানির শিকার হওয়ার পর, ইতালির জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থা ইনপস (INPS) মিজানুরের শারীরিক অক্ষমতার যে হার নির্ধারণ করেছে, তা তাকে সরকারি সাহায্য পাওয়ার অযোগ্য করে তুলেছে। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ইতালীয় বিচারিক ব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ও বৈষম্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনার নৃশংসতা ও নেপথ্য কারণ

ঘটনাটি ঘটেছিল গত মে মাসে। মিজানুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী, যার বয়স ৩৫ বছর, পারিবারিক কলহের জেরে এক রাতে মিজানুরকে ওষুধের মাধ্যমে অচেতন করে ফেলেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, মিজানুর তার প্রথম স্ত্রীকেও একই বাড়িতে নিয়ে এসে সাথে রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা দ্বিতীয় স্ত্রী মানসিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। প্রথম স্ত্রীর সাথে মিজানুরের দুই সন্তান রয়েছে। এই প্রতিহিংসাবশত মিজানুর ঘুমিয়ে পড়লে তার দ্বিতীয় স্ত্রী নৃশংসভাবে তার গোপনাঙ্গ কেটে দেন। বর্তমানে অভিযুক্ত নারী কারাগারে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে ‘অতি গুরুতর শারীরিক জখম’ (Lesioni personali gravissime) করার অভিযোগে বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে।

ইনপস-এর বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও আইনি বাধা

শারীরিক এই ভয়াবহ ক্ষতির পর মিজানুর রহমান স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে তিনি ইতালির সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থা ইনপস (INPS)-এর কাছে অক্ষমতা বা প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য আবেদন করেন। তবে সংস্থাটি তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে তাকে মাত্র ৬৭ শতাংশ অক্ষম বলে ঘোষণা করেছে।

ইতালির বিদ্যমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি মাসিক অক্ষমতা ভাতার (Assegno mensile di assistenza) জন্য যোগ্য হতে চান, তবে তার অক্ষমতার হার ন্যূনতম ৭৪ শতাংশ হওয়া বাধ্যতামূলক। ইনপস-এর এই ৬৭ শতাংশের হার মিজানুরকে নিয়মিত সরকারি ভাতা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। আইনজীবীদের মতে, এমন ভয়াবহ অঙ্গহানির পর এই হার নির্ধারণ করা মিজানুরের শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার প্রতি চরম অবজ্ঞা।

আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া ও লিঙ্গ সমতার প্রশ্ন

মিজানুর রহমানের আইনজীবী অ্যাঞ্জেলো পিসানি (Angelo Pisani) ইনপস-এর এই মূল্যায়নকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি ইতোমধ্যে এই চিকিৎসা-আইনি মূল্যায়নের বিরুদ্ধে আপিল করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। পিসানি সংবাদমাধ্যমকে জানান, মিজানুর যে ধরনের ভয়াবহ এবং অপূরণীয় শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন, ৬৭ শতাংশ অক্ষমতা তার প্রকৃত যন্ত্রণাকে প্রতিফলিত করে না।

আইনজীবী পিসানি এই ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্যের প্রশ্নও তুলেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন যে, সহিংসতার ক্ষেত্রে লিঙ্গভেদে কি বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়? তিনি বলেন, “সহিংসতার কোনো লিঙ্গ নেই। যদি একজন নারী একই ধরনের ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতেন, তবে কি ইনপস তাকে একই মাপকাঠিতে বিচার করত? আমরা সব ভুক্তভোগীর জন্য সমান মর্যাদা এবং সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চাই।” আইনজীবী আরও দাবি করেন যে, মিজানুর কেবল শারীরিক নয়, বরং চরম মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন যা তার মূল্যায়নে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

ফৌজদারি মামলার অগ্রগতি ও ক্ষতিপূরণ

এই মামলাটি বর্তমানে নচেরা ইনফেরিওরে (Nocera Inferiore) আদালতের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। প্রসিকিউশন পক্ষ দাবি করছে যে, এটি একটি পরিকল্পিত হামলা ছিল যেখানে ভুক্তভোগীকে প্রথমে ওষুধের মাধ্যমে অসহায় করে তারপর পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তের জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি এই হামলা চালিয়েছেন কারণ তিনি প্রথম স্ত্রীকে বাড়িতে জায়গা দিতে চাননি।

অন্যদিকে, মিজানুরের পরিবার এবং প্রথম পক্ষের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে আইনজীবীরা অপরাধীর কাছ থেকে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষেও সিভিল বা দেওয়ানি মামলা করার পরিকল্পনা করছেন। মিজানুর রহমান আদৌ ন্যায়বিচার পাবেন কি না এবং তার অক্ষমতার হার পুনর্বিবেচনা করে তাকে সরকারি ভাতার আওতায় আনা হবে কি না, তা এখন উচ্চ আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করছে।

আপাতত, মিজানুর রহমান এবং তার অসহায় পরিবারের জন্য প্রতিটি দিন কাটছে এক অনিশ্চিত লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। একদিকে ভয়াবহ ট্রমার স্মৃতি, অন্যদিকে আর্থিক নিরাপত্তার অভাব—সব মিলিয়ে এক কঠিন সংকটে এই বাংলাদেশি অভিবাসী। ইতালিতে বসবাসরত বিদেশি কমিউনিটির পক্ষ থেকেও এই মামলার অগ্রগতির দিকে গভীর নজর রাখা হচ্ছে।

ইতালির আংরিতে গুরুতর সহিংসতার শিকার এক বাংলাদেশি নাগরিককে ইনপিএস ৬৭% প্রতিবন্ধিতা স্বীকৃতি দিয়েছে; তার আইনজীবী চিকিৎসাগত মূল্যায়ন পুনর্বিবেচনা ও অধিক সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন।

salerno.corriere

Share This Article