ক্রোয়েশিয়া-স্লোভেনিয়া সীমান্ত নদীতে ডুবে পাঁচ অভিবাসীর মৃত্যু: পুলিশের বিরুদ্ধে নীরব দর্শকের ভূমিকার অভিযোগ

3 Min Read

ইতালি প্রবেশের লক্ষ্যে কোলপা নদী পার হওয়ার সময় পুলিশের তাড়া খেয়ে প্রাণ হারালেন পাঁচ যুবক; নিহতদের মধ্যে দুই ভাইকে শনাক্ত করা গেলেও বাকিদের পরিচয় এখনো মেলেনি।

ইউরোপের উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিপজ্জনক বলকান রুট পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশের চেষ্টাকালে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ অভিবাসী। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়া সীমান্তের সেভেরিন না কুপি (Severin na Kupi) এলাকার কোলপা (Kolpa) নদী পার হওয়ার সময় এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। ক্রোয়েশিয়ান পুলিশের তাড়া খেয়ে দলটি যখন খরস্রোতা নদীটিতে ঝাঁপ দেয়, তখন তীব্র স্রোতের টানে তলিয়ে যান পাঁচজন। পরবর্তীতে নদী থেকে তাদের নিথর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ইতালির সীমান্তবর্তী শহর ত্রিয়েস্তের পিয়াচ্ছা লিবের্তায় (Piazza Libertà) পৌঁছানো এক বেঁচে ফেরা অভিবাসী এ ঘটনার এক ভয়াবহ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, অভিবাসীরা যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খরস্রোতা নদীতে নামছিলেন, তখন ক্রোয়েশিয়ান পুলিশ সদস্যরা খুব কাছে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটি প্রত্যক্ষ করছিলেন। দুপুর আনুমানিক তিনটার দিকে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। তার দাবি, বিপদের মুখে পড়ার পরও পুলিশ সদস্যরা তাদের উদ্ধারে এগিয়ে না এসে কেবল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। পানিতে ডুবে সবার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর যখন নিথর মরদেহগুলো ভেসে ওঠে, তখনই কেবল পুলিশ সদস্যরা সেখানে পৌঁছান এবং উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন।

নিহতদের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে ইতালি প্রবাসী ফারমান নামের এক যুবক ত্রিয়েস্তেতে আসেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহত পাঁচজনের মধ্যে দুজনের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। নিহতরা হলেন ফারমানের আপন ছোট ভাই ২৬ বছর বয়সী সৈয়দ করিম এবং ২৭ বছর বয়সী চাচাতো ভাই ফাহাদ। তবে নিহত বাকি তিনজনের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। ফারমান জানান, ওই তিনজনের কাছে কোনো পাসপোর্ট বা বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তাদের নাম ও পরিচয় এখনও পুলিশের কাছেও সম্পূর্ণ অজ্ঞাত রয়েছে।

বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা জানান, নিহত ও বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা সবাই তুরস্কের ইস্তাম্বুল থেকে একসঙ্গে পায়ে হেঁটে দুর্গম বলকান রুট পাড়ি দেওয়া শুরু করেছিলেন। বিভিন্ন দেশের জঙ্গল, বৈরী আবহাওয়া ও পাহাড় পেরিয়ে তাদের চূড়ান্ত গন্তব্য ছিল ইতালি। কিন্তু ক্রোয়েশিয়া-স্লোভেনিয়া সীমান্ত পারাপারের শেষ ধাপে পুলিশের ধাওয়া এবং নদী পারাপারের ঝুঁকি তাদের সেই স্বপ্নকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেয়। পরিচয়পত্রবিহীন এই অভিবাসীদের এমন সলিলসমাধি বলকান রুটে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের চরম নিরাপত্তাহীনতা ও পুলিশি আচরণের নির্মম বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

বর্তমানে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো ক্রোয়েশিয়ার রিজেকা (Fiume) শহরের একটি সরকারি মর্গে রাখা হয়েছে। ফারমানের কাছে ইতালির বৈধ রেসিডেন্স পারমিট থাকায় ক্রোয়েশিয়ান কর্তৃপক্ষ মরদেহ দুটি ইতালিতে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে ফারমান চান মরদেহগুলো স্বদেশে পাকিস্তানে তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে। এ লক্ষ্যে ত্রিয়েস্তের পিয়াচ্ছা লিবের্তায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘লিনিয়া দোমব্রা’র (Linea d’Ombra) সহায়তায় অবস্থানরত অভিবাসী এবং বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা মিলে জরুরি তহবিল সংগ্রহ শুরু করেছেন। মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠাতে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সবাই চাঁদা দিচ্ছেন। স্বজনদের শেষবারের মতো দেখার আকুতি নিয়ে স্বদেশে তাদের পরিবার কান্নায় ভেঙে পড়েছে।


ক্রোয়েশিয়ার কোলপা নদী পার হতে গিয়ে পাঁচ অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে; নিহতদের মধ্যে ফারমানের ভাই ও চাচাতো ভাইও রয়েছেন, আর স্বজনরা মরদেহ পাকিস্তানে ফেরানোর চেষ্টা করছেন।

rainews

Share This Article