ইতালিতে পারিবারিক কেয়ারগিভারদের সুরক্ষায় নতুন বিল: মাসিক ৪০০ ইউরো ভাতার প্রস্তাব, শর্ত নিয়ে বিতর্ক

4 Min Read

অসুস্থ ও অক্ষম স্বজনদের নিঃস্বার্থ সেবাদানকারীদের আইনি স্বীকৃতি দিতে জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করছে ইতালি; তবে কঠোর আয়ের সীমা ও অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার বাধ্যবাধকতায় সিংহভাগ সেবাদাতা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইতালির সার্বিক কল্যাণ ও স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর নেপথ্যে থাকা পারিবারিক কেয়ারগিভারদের (Caregiver familiare) আনুষ্ঠানিক আইনি স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা দিতে জাতীয় পর্যায়ে একটি নতুন আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে। গুরুতর অসুস্থ, প্রতিবন্ধী কিংবা বয়োবৃদ্ধ স্বজনদের কোনো ধরনের পারিশ্রমিক ছাড়াই বছরের পর বছর সেবা দিয়ে আসা এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশটির আইনসভায় পর্যালোচনায় থাকা এই বিলে সুবিধাভোগীদের জন্য প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ৪০০ ইউরো পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ভাতার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে এই সহায়তার সঙ্গে যুক্ত হওয়া অতিমাত্রায় কঠোর শর্তাবলি নিয়ে ইতিমধ্যে নাগরিক অধিকারকর্মী ও সেবা খাতের প্রতিনিধিদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইস্তাত (ISTAT)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে কেয়ারগিভারের সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি, যা সমগ্র ইতালির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তাদের মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ সার্বক্ষণিকভাবে একই ছাদের নিচে বসবাসকারী গুরুতর শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী স্বজন কিংবা ৭৫ বছরের বেশি বয়সী অক্ষম স্বামী বা স্ত্রীর সেবা করছেন। পাশাপাশি বহু প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান নিজেদের কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে আপস করে বয়োবৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন। চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া, সরকারি কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা, রান্নাবান্নাসহ গৃহস্থালি কাজকর্ম এবং সার্বক্ষণিক মানসিক ভরসা জোগানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো এরাই প্রতিদিন নিঃশব্দে বহন করছেন।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই পারিবারিক সেবাদানের সবচেয়ে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক মাশুল গুনতে হচ্ছে নারীদের। রোগীর সার্বক্ষণিক শুশ্রূষার দায়িত্ব মূলত পরিবারের নারী সদস্যদের কাঁধেই এসে পড়ে। এর ফলে অসংখ্য নারীকে মাঝপথেই নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে দিতে হচ্ছে। কর্মজীবন হারিয়ে তারা যেমন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বিতা হারাচ্ছেন, তেমনি নিয়মিত অবসরকালীন পেনশন ফান্ডে অবদান (contributi previdenziali) রাখার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে পরিণত বয়সে গিয়ে তাদের মারাত্মক আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হচ্ছে।

প্রস্তাবিত নতুন বিলে এই পরিস্থিতি নিরসনে আইনি কাঠামোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঘোষিত ভাতা পাওয়ার মাপকাঠি রাখা হয়েছে অত্যন্ত সংকীর্ণ। বিলে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো কেয়ারগিভার তখনই এই আর্থিক অনুদান পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, যখন তার বার্ষিক মোট ব্যক্তিগত আয় ৩ হাজার ইউরোর নিচে থাকবে। যদিও সেবা গ্রহণকারীর সঙ্গে একই বাড়িতে থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি, তবুও আবেদনকারীকে প্রতি সপ্তাহে ন্যূনতম ৯১ ঘণ্টা রোগীর সেবায় ব্যয় করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ দিনে গড়ে প্রায় ১৩ ঘণ্টা রোগীর পেছনে ব্যয় না করলে কেউ এই সুবিধার আওতায় আসবেন না। চূড়ান্ত ভাতার পরিমাণ আবেদনকারীর মোট সংখ্যা ও তহবিলের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হবে।

ইতালি সরকার ২০২৭ সালের বাজেটে এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ২৫ কোটি ইউরো বরাদ্দের পরিকল্পনা করেছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, বছরে মাত্র ৩ হাজার ইউরো আয়ের সীমা এবং সপ্তাহে ৯১ ঘণ্টার কঠোর শ্রমের শর্ত পূরণ করা বাস্তবসম্মত কেয়ারগিভারদের পক্ষে অত্যন্ত দুরূহ। ফলে বিশাল অঙ্কের রাষ্ট্রীয় তহবিল থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত সুবিধাভোগীর সংখ্যা হবে হাতেগোনা কয়েকজন। লাখ লাখ ত্যাগী সেবাদাতাকে সামাজিক সুরক্ষার বাইরে রেখে প্রণীত এই খসড়া আইন শেষ পর্যন্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা নিয়ে আইনসভার ভেতর ও বাইরে এখন জোরালো বিতর্ক চলছে।


ইতালিতে ১২ মিলিয়নের বেশি caregiver প্রতিদিন অসুস্থ ও অক্ষম স্বজনদের বিনামূল্যে সেবা দেন; প্রস্তাবিত আইনে যোগ্যদের মাসে সর্বোচ্চ ৪০০ ইউরো সহায়তা মিলবে, তবে সপ্তাহে অন্তত ৯১ ঘণ্টা সেবার শর্ত।

Tg3

Share This Article