ইতালির পালের্মো শহরে হকারবিরোধী অভিযানে জব্দ পণ্যে উপচে পড়ছে পুলিশের গুদাম; স্থানীয়রা নিয়ম না মানলেও জরিমানা পরিশোধে অনন্য নজির গড়ছেন বাংলাদেশি প্রবাসীরা।
ইতালির সিসিলি দ্বীপের রাজধানী পালের্মোর ঐতিহাসিক কেন্দ্রস্থলে অবৈধ ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা বন্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল পুলিশ (Polizia Municipale)। শহরের উগো লা মালফা সড়কে অবস্থিত পুলিশ সদর দপ্তরের গুদামগুলো এখন অবৈধ বিক্রেতাদের কাছ থেকে জব্দ করা হাজার হাজার পণ্যে উপচে পড়ছে। তবে এই অভিযানের প্রেক্ষিতে এক অদ্ভুত ও চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা—স্থানীয় ইতালীয় ব্যবসায়ীরা জরিমানা এড়িয়ে যাওয়ার নানা ফন্দি খুঁজলেও, নিয়মিত ও দ্রুত জরিমানা পরিশোধ করছেন মূলত অভিবাসীরা, বিশেষ করে বাংলাদেশিরা।
নিয়ম মেনে জরিমানা মেটাচ্ছেন বাংলাদেশিরা
পালের্মোর পুলিশ কমিশনার রোজারিও গাম্বিনো এক সাক্ষাৎকারে জানান, “শহরের কেন্দ্রস্থলে অবৈধভাবে ব্যবসা করা স্থানীয় বা অন্যদের জরিমানা করা হলেও প্রায় কেউই সেই অর্থ পরিশোধ করে না। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এই জরিমানা যারা নিয়মিত পরিশোধ করছেন, তারা প্রধানত অভিবাসী এবং এদের মধ্যে অধিকাংশই বাংলাদেশি।”
একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তিনি জানান, সম্প্রতি প্রশাসনিক নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে এক বাংলাদেশি নাগরিককে ৮০০ ইউরো জরিমানা করা হয়েছিল। নিয়ম অমান্য করার কোনো চেষ্টা না করে সেই বাংলাদেশি প্রবাসী মাত্র তিন দিনের মাথায় জরিমানার পুরো অর্থ পরিশোধ করে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।
জব্দ করা পণ্যের স্তূপ ও অভিযানের খতিয়ান
শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্রে অবৈধ হকারদের কার্যক্রমকে ‘আগাছার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন পুলিশ কমান্ডার আনজেলো কোলুচেল্লো। তিনি বলেন, “কোয়াত্রো কান্তি চত্বরে পুলিশের টহল দল একটু সরে গেলেই অবৈধ বিক্রেতারা আবার ফিরে আসে।”

গত তিন মাসে পুলিশের চালানো অভিযানের একটি বিশদ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে:
- মোট ৬৭টি সরেজমিন পরিদর্শন ও ৭৫টি পৃথক অভিযানের মাধ্যমে ৯২টি প্রশাসনিক লঙ্ঘনের মামলা করা হয়েছে।
- অভিযানে ৯৪টি ভ্রাম্যমাণ ট্রলি বা ঠেলাগাড়ি, ১ হাজার ৮৭০টি মদের বোতল এবং ৮৫০ কেজি খাদ্যসামগ্রী জব্দ করা হয়। জব্দকৃত খাদ্যদ্রব্যের একটি বড় অংশ স্থানীয় বিভিন্ন দাতব্য সংস্থাকে দান করেছে পুলিশ।
- গত কয়েক মাসে প্রায় ১৮ হাজার নকল বা অনুমোদনহীন পণ্য জব্দ করা হয়েছে। ভালো মানের ব্যাকপ্যাক ও ট্রাভেল ব্যাগ বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থাকে দান করা হলেও বাকি পণ্যগুলো ধ্বংসের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পাঠানো হয়েছে।
গুদামে জায়গা সংকট ও বিচিত্র পণ্যের সমাহার
জব্দকৃত পণ্যের পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে পুলিশ সদর দপ্তরের নিচতলার গুদাম ছাপিয়ে দোতলার দুটি বড় কক্ষ এখন অস্থায়ী গুদামে রূপান্তর করতে হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে সৈকত ছাতা, মিনি ফ্রিজ, ওভেন, ঝুড়ি, কাঠের টেবিল থেকে শুরু করে “ফরজা পালের্মো” লেখা ব্যানার পর্যন্ত। এছাড়া মন্ডেল্লো সৈকত এবং নগরকেন্দ্র থেকে ৮ থেকে ১০ ইউরোতে অবৈধভাবে বিক্রি হওয়া বিপুল পরিমাণ টয়লেট পেপারের রোলও জব্দ করেছে পুলিশ।
আইনি দীর্ঘসূত্রতা ও পুলিশের জনবল সংকট
কমান্ডার কোলুচেল্লো জানান, জব্দ করা মালামাল বাজেয়াপ্ত করার আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ। একটি সাধারণ চেয়ার বা ছাতা পুরোপুরি বাজেয়াপ্ত করতেও অন্তত ছয় মাস অপেক্ষা করতে হয়, আর আদালতের মামলার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এদিকে নিয়মিত অভিযান চালানো সত্ত্বেও অনেক নাগরিক মনে করছেন তদারকি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তবে সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে পুলিশ কমান্ডার জানান, বর্তমানে তাদের বাহিনীতে প্রায় ৮০০ জন পুলিশ সদস্যের ঘাটতি রয়েছে। এই তীব্র জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও পুলিশ সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কেন্দ্রীয় ফোন নম্বরে দৈনিক প্রায় আড়াই হাজার অভিযোগের কল আসে।
পালেরমোর অবৈধ ব্যবসাবিরোধী অভিযানে ৬৭টি পরিদর্শনে ৭৫টি জব্দ ও ৯২টি নিয়মভঙ্গ শনাক্ত; ১৮ হাজারের বেশি নকল বা অননুমোদিত পণ্য উদ্ধার হলেও জরিমানা পরিশোধে প্রবাসীরাই বেশি দায়িত্বশীল।
palermo.repubblica


