জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের অভিযোগ তুলে ডানপন্থীদের প্রস্তাবিত বিতর্কিত ‘সেভ ইউরোপ অ্যাক্ট’ নিবন্ধন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইইউ; এই সিদ্ধান্তের ফলে অ-পশ্চিমা দেশগুলো থেকে অভিবাসন বন্ধের পথ রুদ্ধ হলো।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে অ-পশ্চিমা দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের প্রবেশাধিকার পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্যে আনা একটি গণ-উদ্যোগ বা সিটিজেনস ইনিশিয়েটিভ নাকচ করে দিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন। ‘সেভ ইউরোপ অ্যাক্ট’ (Save Europe Act) নামে পরিচিত এই প্রস্তাবটি মূলত কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা ছিল, যা আইনিভাবে কার্যকর করার প্রাথমিক ধাপেই হোঁচট খেল। কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, মানুষের জাতিগত, সাংস্কৃতিক বা সভ্যতাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো ধরণের বৈষম্য করা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৌলিক মানবাধিকার ও আইনি কাঠামোর পরিপন্থী।
গত ২২ জুলাই বুধবার কমিশন তাদের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়। গত মাসে ‘সেভ ইউরোপ অ্যাক্ট’ নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হয়েছিল। তবে প্রাথমিক যোগ্যতা যাচাই শেষে কমিশন জানায়, এই প্রস্তাবটি বর্ণ এবং জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে, যা সরাসরি বৈষম্যমূলক। আয়োজকদের দাবি ছিল, ইউরোপের নিজস্ব ঐতিহ্য, পরিচয় ও জীবনযাত্রা রক্ষার জন্য অভিবাসন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। তারা অভিবাসীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যাকে ‘জনতাত্ত্বিক প্রতিস্থাপন’ (Demographic Replacement) হিসেবে অভিহিত করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
‘সেভ ইউরোপ অ্যাক্ট’-এর অধীনে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল অ-পশ্চিমা দেশগুলো থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ভিসা এবং ফ্যামিলি রিইউনিফিকেশন বা পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা। এছাড়া, যারা অবৈধভাবে অবস্থান করছেন কিংবা যাদের আশ্রয়ের আবেদন (Asylum) নাকচ হয়েছে, তাদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ‘রি-মাইগ্রেশন’ (Remigration) প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা এবং বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তগুলো পারস্পরিকভাবে স্বীকৃতির দাবি জানানো হয়েছিল। এমনকি অভিবাসীদের আকৃষ্ট করতে পারে এমন কল্যাণমূলক সুবিধা বা সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ব্যবস্থাগুলো বন্ধ করার প্রস্তাবও ছিল এই অ্যাক্টে।

ইউরোপীয় কমিশন তাদের বিবৃতিতে এই প্রত্যাখ্যানের আইনি ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছে, প্রস্তাবিত এই স্থগিতাদেশ মূলত মানুষের বংশগতি বা জাতিগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী প্রতিটি আবেদনকারীর প্রোফাইল আলাদাভাবে বা ‘কেস-বাই-কেস’ ভিত্তিতে যাচাই করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই প্রস্তাবটি সেই আইনি বাধ্যবাধকতাকে লঙ্ঘন করে কেবল অ-পশ্চিমা দেশ হওয়ার কারণে ঢালাও নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
ইউরোপীয় নাগরিক উদ্যোগ (European Citizens’ Initiative – ECI) হলো ইইউ-এর একটি গণতান্ত্রিক হাতিয়ার, যার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকরা কমিশনের কাছে নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিতে পারেন। ২০১২ সালে এটি চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৩৫টি উদ্যোগ নিবন্ধিত হয়েছে। কোনো প্রস্তাব নিবন্ধিত হলে আয়োজকরা এক বছর সময় পান অন্তত সাতটি সদস্য দেশ থেকে ১০ লাখ বৈধ স্বাক্ষর সংগ্রহের জন্য। তবে স্বাক্ষর সংগ্রহ সম্পন্ন হলেও কমিশন সেই প্রস্তাব অনুযায়ী আইন তৈরি করতে বাধ্য নয়, তারা কেবল বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানাতে বাধ্য থাকে।
কমিশনের এই প্রত্যাখ্যানের পর ‘সেভ ইউরোপ অ্যাক্ট’-এর নেপথ্যে থাকা অ্যাক্টিভিস্টরা জানিয়েছেন, তারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করার পরিকল্পনা করছেন। এই সিদ্ধান্তটি ইউরোপে বসবাসরত অ-পশ্চিমা দেশগুলোর (যেমন বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তান) অভিবাসী, শিক্ষার্থী এবং যারা পরিবারের সদস্যদের ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আনতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য বড় স্বস্তির খবর। এটি প্রমাণ করে যে, ইউরোপীয় প্রশাসন বর্তমান মানবাধিকার আইনের অধীনে বর্ণবাদী বা বৈষম্যমূলক কোনো আইনি পরিবর্তন সহজে গ্রহণ করবে না। তবে কট্টরপন্থীদের আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা অভিবাসন ইস্যুটিকে ভবিষ্যতে আরও বিতর্কিত করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, সিদ্ধান্ত, পরিসংখ্যান বা প্রভাব থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শব্দের একটি সংক্ষিপ্ত ও তথ্যবহুল হাইলাইট লাইন নির্বাচন করুন, যা পাঠককে মূল ঘটনা দ্রুত বুঝতে সাহায্য করবে।
infomigrants


