গাজা উপত্যকায় প্রাণ হারানো ১৮ হাজার ৪০০ শিশু ও কিশোরের স্মরণে ইতালির রিকিয়ন সৈকতে আয়োজিত হলো এক বিশাল শান্তি সমাবেশ; নিহতদের নাম সম্বলিত ২৫ মিটার লম্বা তেরপাল বহন করে সংহতি প্রকাশ করলেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা।
ইতালির বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র রিকিয়ন (Riccione) সৈকতে শনিবার এক হৃদয়স্পর্শী এবং ব্যতিক্রমী শোকসভার আয়োজন করা হয়। গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধে নিহত হাজার হাজার নিষ্পাপ শিশুদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সমুদ্রের তীর ঘেঁষে আয়োজন করা হয় এক বিশাল পদযাত্রার। “গাজার শিশুদের জন্য সুডারিও” (Sudario for the Children of Gaza) বা ‘গাজার শিশুদের জন্য শোকবস্ত্র’ শীর্ষক এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে শান্তির বার্তা প্রচার করেন কয়েকশ মানুষ।
এই অভাবনীয় বিক্ষোভ ও স্মৃতিচারণ কর্মসূচির প্রধান আকর্ষণ ছিল বিশাল একটি সাদা তেরপাল বা কাপড়, যা শোকের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সাড়ে সাত মিটার চওড়া এবং পঁচিশ মিটার লম্বা এই বিশাল শুভ্র কাপড়ে গাজায় নিহত ১৮ হাজার ৪০০ জন শিশু ও কিশোরের নাম হাতে লেখা ছিল। পদযাত্রীরা যখন ক্যানাল পোর্ট (Canal Port) থেকে পিয়াজজেল সান মার্টিনো (Piazzale San Martino) পর্যন্ত সৈকতের বালুকাময় পথ ধরে এই বিশাল তেরপালটি বহন করছিলেন, তখন সেখানে উপস্থিত পর্যটক এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মন্ডডোনা অনলাস (Mondodonna Onlus) অ্যাসোসিয়েশন এবং ‘জয়েন্ট কারুনিয়া পার লা পেস’ (Join Karunia per la Pace)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিটি কেবল একটি প্রতিবাদী সমাবেশ ছিল না, বরং এটি ছিল এক সম্মিলিত মানবিক প্রার্থনা। আয়োজকরা জানিয়েছেন, এই বিশাল শোকবস্ত্রটি এর আগে সেসিনা (Cecina) শহরে প্রদর্শিত হয়েছিল। সেখান থেকে এটি রিকিয়ন শহরে নিয়ে আসা হয়। প্রতিটি নাম হাতে লেখার উদ্দেশ্য ছিল নিহত শিশুদের সংখ্যাকে কেবল পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে তাদের প্রত্যেককে স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া।

এই শান্তি সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রিমিনির (Rimini) বিশপ নিকোলা আনসেলমি (Nicola Anselmi)। তিনি নিহত শিশুদের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, শিশুদের জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সমগ্র বিশ্ববাসীর নৈতিক দায়িত্ব। রিকিয়ন পৌরসভা এবং রিমিনি প্রদেশ এই সংহতি সমাবেশের আনুষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছে, যা এই উদ্যোগের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সৈকতে পদযাত্রার পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সের মানুষ এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে গাজায় ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। পদযাত্রার সময় সৈকতের কোলাহল ছাপিয়ে এক গম্ভীর নিস্তব্ধতা নেমে আসে। অংশগ্রহণকারীদের মতে, ইতালির মতো পর্যটন প্রধান দেশে এমন উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠানো সম্ভব হয়েছে। তারা মনে করেন, শিশুদের ওপর এই নৃশংসতা বন্ধে বিশ্বনেতাদের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।
কর্মসূচির সমাপ্তিতে আয়োজকরা জানান, এই বিশাল নাম সম্বলিত তেরপালটি ভবিষ্যতে অন্যান্য শহরগুলোতেও নিয়ে যাওয়া হবে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গাজার নিরপরাধ শিশুদের প্রতি সংহতি অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। রিকিয়ন সৈকতের এই সম্মিলিত শোকগাথা কেবল ইতালিতে নয়, বরং বিশ্বজুড়ে শান্তির স্বপক্ষ শক্তিকে অনুপ্রাণিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিহত শিশুদের নাম সম্বলিত এই পদযাত্রাটি যখন গন্তব্যে পৌঁছায়, তখন রিকিয়ন সৈকত এক মুহূর্তের জন্য যুদ্ধের বিভীষিকা আর শান্তির আকুল প্রার্থনার সঙ্গমস্থলে পরিণত হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসূচিটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হয়েছে।

