ইতালির পোশাক শিল্পে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাফল্য : এর প্রভাব ও সম্ভাবনা

8 Min Read

লেখা- ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এটিএম রকিবুল হক

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) খাত উন্নয়নশীল বিশ্বের অন্যতম উল্লেখযোগ্য শিল্প সাফল্যের উদাহরণ। সত্তরের দশকের শেষভাগে সীমিত পরিসরে যাত্রা শুরু করা এই খাত আজ জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ডে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এই খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৭৫-৮০% নিশ্চিত করার পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং শিল্পখাতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং ক্রমাগত মানোন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং অন্যান্য বাজারে শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর জন্য অন্যতম প্রধান নির্ভরযোগ্য পোশাক সরবরাহকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এই খাতের প্রভাব শুধু বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে এর বিস্তার ঘটেছে বিশ্বের অন্যান্য দেশে। ইতালিতে এই বাস্তবতা বিশেষভাবে দৃশ্যমান। ফ্যাশন, জুয়েলারি ও কারুশিল্পে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এই দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিরা পোশাক, জুয়েলারি, কৃষি, জাহাজ নির্মাণ সহায়তা, চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন, পর্যটন এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি গড়ে তুলেছেন। এর মধ্যে পোশাক খাতে তাদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেখানে হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক ও উদ্যোক্তা ইতালির ফ্যাশন সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছেন।

দক্ষিণ ইতালির একটি ক্রমবিকাশমান শিল্পকেন্দ্র

নাপোলি শহরের নিকটবর্তী, বিশেষত পালমা ক্যাম্পানিয়া এবং এর আশেপাশের এলাকায় একটি শক্তিশালী শিল্পকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন অসমর্থিত তথ্য অনুযায়ী, সান জেনারো ভিলানিয়ানা, সান জিউসেপ্পে ভিলানিয়ানা, পোমিলিয়ানো, তেরজিনিয়া, সাভিয়ানো এবং অত্তাভিয়ানোসহ পার্শ্ববর্তী কমিউনগুলোতে ৪০০-এর বেশি ছোট ও মাঝারি আকারের তৈরি পোশাক উৎপাদন ইউনিট পরিচালিত হচ্ছে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক, ব্যবস্থাপক ও কর্মীদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশি।

ইতালির পালমা ক্যাম্পানিয়া শহরের একটি পোশাক কারখানা

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে গড়ে ১০ থেকে ১০০ জন কর্মী কাজ করেন এবং সম্মিলিতভাবে এ সকল প্রতিষ্ঠানে ১২,০০০-এরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের পাশাপাশি ইতালিয়ান ও অন্যান্য দেশের অভিবাসীরাও কর্মরত রয়েছেন মর্মে পালমা ক্যাম্পানিয়ার ফ্যাক্টরির মালিকগণ দাবি করেন। ইতালিয়ান ক্রেতা ও ফ্যাশন কোম্পানিগুলো সাধারণত ডিজাইন, প্যাটার্ন, কারিগরি নির্দেশনা এবং কাঁচামাল সরবরাহ করে থাকেন। এরপর এ সকল প্রতিষ্ঠানে সেলাই, দর্জির কাজ, ফিনিশিং এবং প্যাকেজিং সম্পন্ন করা হয়। ইতালিয়ান কাঁচামাল বাংলাদেশি উদ্যোগ ও দক্ষতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারজাত উপযোগী পণ্যে রূপান্তর করে, যা ইতালি ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসহ এবং বিশ্বের দেশে বিক্রয় হয়।

প্রথম প্রজন্মের বাংলাদেশী অভিবাসীদের উদ্যোগ এবং অক্লান্ত পরিশ্রমে এই প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে উঠেছে, যারা অভিবাসী হিসেবে ইতালিতে এসে বাজার অনুসন্ধান করেছেন, স্থানীয় নিয়ম ও পদ্ধতির সাথে মানিয়ে নিয়ে ক্রমেই সফল উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশিদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য- কঠোর পরিশ্রম, এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সাফল্য অর্জনের উদ্দীপনার কারণে এ খাত স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

ইতালির পালমা ক্যাম্পানিয়া শহরের একটি পোশাক কারখানা

বাংলাদেশ ও ইতালি উভয় দেশের অর্থনীতিতে অবদান

ইতালির স্থানীয় উৎপাদন প্রবাহ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ অব্যাহত রাখা এবং উচ্চ প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বাজারে তৈরি পোশাক শিল্পকে টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে ইতালির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি রক্ষায় পোশাক শিল্পের এই খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই উদ্যোগ/কারখানাগুলোর অবদান বাংলাদেশের জন্যও সমানভাবে অর্থবহ। এই শিল্প হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি দেশীয় উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার একটি শক্তিশালী নিদর্শন। এই শিল্পে কর্মরত হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, পরিবারকে সহায়তা করছেন এবং জাতীয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অবদান রাখছেন। তাদের পরিশ্রম, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে অভিযোজন ও উন্নত অর্থনীতিতে অবদান রাখার সক্ষমতা প্রবাসে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ইতিবাচক ও উজ্জ্বল করছে। উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে ইতালির ব্যবসায়ীগণ যে মুনাফা অর্জন করছেন তা ইতালির অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।

বাংলাদেশি শ্রমিকরা উচ্চমূল্যের বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও নির্ভরযোগ্যতার পরিচয় তুলে ধরছেন।

রাষ্ট্রদূত এটিএম রকিবুল হক

বাংলাদেশি পোশাক কারখানায় ইতালিয়ান ব্র্যান্ডের ব্যবহার

ভাবমূর্তি ও আস্থার বহিঃপ্রকাশ

পোশাক শিল্পের দক্ষতা, শ্রমের রূপান্তর ও স্থানান্তরের মাধ্যমে ইতালিতে বাংলাদেশিরা একটি নতুন পরিচয় সৃষ্টি করেছে। ইতালির এই উৎপাদন ইউনিটগুলোতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দক্ষতায় তৈরি পণ্যে যখন “Made in Italy” লেবেল যুক্ত হয়, তখন তা শুধু একটি পণ্য হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং আস্থা ও মানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশি শ্রমিকরা উচ্চমূল্যের বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও নির্ভরযোগ্যতার পরিচয় তুলে ধরছেন।

এভাবে তারা শ্রমিক থেকে উদ্যোক্তা এবং প্রবাসী থেকে অংশীদারে পরিণত হচ্ছেন। তাদের এই ক্রমপুঞ্জিত অবদান পরিসংখ্যানযোগ্য না হলেও তারা ইতালিয়ান সমাজে ক্রমেই নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছেন এবং এভাবেই তারা ইতালির অর্থনীতি ও সমাজে প্রবাসী বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াতেও অবদান রাখছেন।

বাংলাদেশের জন্য করণীয়

ইতালিতে প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের সাফল্যসমূহ বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক ও অংশীজনদের জন্য ভবিষ্যত করণীয় নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, এই সাফল্যসমূহের তথ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সকলের জ্ঞাতার্থে উপস্থাপন করা প্রয়োজন, যা ইতালিতে বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি উন্নয়ন এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, এই সাফল্যসমূহের প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে ইতালিতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এই খাতের সাফল্য ও সম্ভাবনাসমূহ ইতালির শ্রমবাজারে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মের গতি-প্রকৃতি পরিবর্তন করবে এবং ইতালিতে নতুনভাবে আসতে আগ্রহী বাংলাদেশিদেরকে দক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে অবদান রাখতে পারে।

তৃতীয়ত, যথাযথ পর্যালোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করতে, উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণ করতে, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। ইতালীয় ব্র্যান্ডগুলির সাথে আরও গভীর সংযোগ স্থাপন করতে উদ্যোগ গ্রহণে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারে।

চতুর্থত, বাংলাদেশর পোশাকশিল্পে নিয়োজিত টেইলারিং, যন্ত্র পরিচালনা, প্যাটার্ন-মেকিং এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি খাতে প্রশিক্ষিত দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মীদের জন্য পরিকল্পনাবদ্ধ অভিবাসন প্রক্রিয়া গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। ইতালির শিল্প-অর্থনীতি খাতে কর্মীর চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা করা সম্ভব হলে তা উভয় দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য পারস্পরিক লাভজনক হবে। এ লক্ষ্যে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নিয়োজিত প্রশিক্ষিত ও দক্ষ শ্রমিকদেরকে এই কারখানাসমূহে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে।

পালমা ক্যাম্পানিয়ার একটি পোশাক কারখানা পরিদর্শনে রাষ্ট্রদূত রকিবুল হক

ইতালির পালমা ক্যাম্পানিয়ার এই অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক সাফল্যের বিবরণ নয়, বরং এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধ্যবসায়, কর্মস্পৃহা এবং সাফল্যের একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্পগাথা। এটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দক্ষতার বৈশ্বিক বিস্তার এবং এর শ্রমশক্তির অসাধারণ সহনশীলতার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। ঢাকার পোশাক কারখানা থেকে ক্যাম্পানিয়ার পোশাক কারখানা পর্যন্ত সকল শহরে বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও শ্রমিকরা একীভূত অগ্রগতি এবং সম্মিলিত সমৃদ্ধির একটি শক্তিশালী ধারা তৈরি করে চলেছেন।

এই সংযোগকে যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান ও লালন করা হলে বাংলাদেশ-ইতালি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে পারে, শিল্পক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব আরও গভীরতর হতে পারে এবং বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের মর্যাদা উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। এই শিল্পের সাফল্য ও ব্যাপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের শ্রম বাজার আরো সম্প্রসারণ করা সম্ভব যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে। এ লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং বিজিএমইএ-র মতো ব্যবসায়িক সংগঠনসহ বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই সেক্টরটি দেশের জন্য নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

TAGGED:
Share This Article