ইতালির শ্রমবাজারে প্রবাসীদের জয়জয়কার: মোট কর্মসংস্থানের ১০ শতাংশই এখন বিদেশি

4 Min Read

ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে অভিবাসী কর্মীদের অপরিহার্য ভূমিকার চিত্র; কর্মসংস্থানের হার বাড়লেও বেতন বৈষম্য ও দারিদ্র্যের ঝুঁকি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

ইউরোপের অন্যতম প্রধান অর্থনীতির দেশ ইতালির শ্রমবাজারে অভিবাসী বা বিদেশি কর্মীদের গুরুত্ব ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশটির শ্রম ও সামাজিক নীতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় (Ministero del Lavoro e delle Politiche Sociali) সম্প্রতি ‘শ্রমবাজারে বিদেশি কর্মী’ শীর্ষক তাদের ১৪তম বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বর্তমানে ইতালির মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছেন বিদেশি নাগরিকরা, যা দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ইতালিতে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২৪ লক্ষ (২.৪ মিলিয়ন) ছাড়িয়েছে। এটি দেশটির মোট কর্মসংস্থানের ১০.৭ শতাংশ। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বিদেশি নাগরিকদের কর্মসংস্থানের হার ১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬০.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক কর্মীর মধ্যে প্রায় ১৮ লক্ষই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের বিভিন্ন দেশের (Non-EU) নাগরিক, যা মোট শ্রমশক্তির ৮ শতাংশ।

প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে সবচেয়ে বেশি। সেবা খাত (Tertiary sector), কৃষি এবং নির্মাণ শিল্পে প্রবাসীরা সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছেন। বিশেষ করে আবাসন, খাদ্য সরবরাহ এবং গৃহস্থালি সেবা বা কেয়ারগিভার হিসেবে অভিবাসীদের উপস্থিতি অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে একটি উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদেশি কর্মীদের ৩১.৭ শতাংশই অত্যন্ত নিম্ন-দক্ষতার কাজে (Unskilled labor) নিয়োজিত, যেখানে ইতালীয় নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৮.২ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানে স্পষ্ট যে, উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পরেও অনেক বিদেশি নাগরিক যোগ্যতার তুলনায় নিম্নমানের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

আর্থিক দিক দিয়েও বিদেশি এবং স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে বড় ধরণের পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, একজন বিদেশি শ্রমিকের গড় মাসিক বেতন বর্তমানে ১,১৪৬ ইউরো। অন্যদিকে, ইতালীয় নাগরিকদের গড় মাসিক বেতন প্রায় ১,৬০০ ইউরোর উপরে। এই মজুরি বৈষম্যের ফলে অনেক প্রবাসী কাজ করার পরেও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন, যাকে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘শ্রমজীবী দরিদ্র’ বা ‘ওয়ার্কিং পুওর’ (Working Poor) হিসেবে অভিহিত করেছেন।

লিঙ্গভেদে কর্মসংস্থানের হারেও বড় ধরণের বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়েছে। ইতালিতে অ-ইউরোপীয় নারীদের কর্মসংস্থানের হার মাত্র ৪৪.৬ শতাংশ, যা বিদেশি পুরুষদের (৭৬.৬ শতাংশ) তুলনায় অনেক কম। তবে গত এক বছরে ইউক্রেনীয় নারীদের শ্রমবাজারে প্রবেশের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নারী কর্মীদের পরিসংখ্যানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বেকারত্বের হারের ক্ষেত্রেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। বর্তমানে বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১১.৮ শতাংশ, যা ২০২২ সালের (১২.৩ শতাংশ) তুলনায় কিছুটা কম। তবে এটি এখনো স্থানীয় ইতালীয়দের বেকারত্বের হারের তুলনায় যথেষ্ট বেশি। ইতালির জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থা ইনপিএস (INPS)-এর তথ্যানুযায়ী, বিদেশি কর্মীদের দেওয়া কর এবং বীমার টাকা দেশটির পেনশন ব্যবস্থা সচল রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতালির ক্রমহ্রাসমান জন্মহার এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যতে শ্রমবাজারে এই শূন্যতা পূরণে প্রবাসীদের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। অভিবাসীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আইনি প্রক্রিয়া সহজতর করা হলে তারা ইতালির জিডিপিতে (GDP) আরও বড় ধরণের অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে প্রতিবেদনে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। পরিশেষে, ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয় জোর দিয়েছে যে, কেবল সংখ্যাগত বৃদ্ধি নয়, বরং অভিবাসীদের ন্যায্য মজুরি এবং কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনের মূল লক্ষ্য।

ইতালির শ্রমবাজারে এখন ২৬ লাখ বিদেশি কর্মী,
যারা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ১০.৭ শতাংশ এবং প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি।

ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতি মন্ত্রণালয় (MLPS)

TAGGED:
Share This Article