মিলানের জৌলুসের আড়ালে শ্রম শোষণের রূঢ় চিত্র: প্রতি পাঁচ শ্রমিকের একজনই পাচ্ছেন নামমাত্র মজুরি

4 Min Read

পোলিস লম্বারদিয়ার গবেষণায় মহানগরীর প্রায় ২ লাখ কর্মীর চরম আর্থিক দীনতা ও ‘ওয়ার্কিং পুওর’ পরিস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে; শোষণের এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন নারী ও বিদেশি অভিবাসীরা।

ইতালির অর্থনৈতিক রাজধানী এবং ফ্যাশন ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মিলান শহরের বাহ্যিক জৌলুসের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মিলান মহানগরী বা মেট্রোপলিটান সিটিতে কর্মরত প্রতি পাঁচজন শ্রমিকের মধ্যে একজন অত্যন্ত নিম্ন মজুরিতে কাজ করছেন। আঞ্চলিক নীতিনির্ধারণী সংস্থা ‘পোলিস লম্বারদিয়া’ (Polis Lombardia)-র সর্বশেষ এক বিশেষ সমীক্ষায় এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মিলান মহানগর এলাকায় প্রায় ২ লক্ষ মানুষ বর্তমানে নামমাত্র বেতনে শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছেন। শতাংশের হিসেবে এটি মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ১৮.৮ শতাংশ। অর্থাৎ, একটি বিশাল জনগোষ্ঠী দিনরাত পরিশ্রম করার পরেও তাদের আয়ের পরিমাণ জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। এই পরিস্থিতিকে সমাজতাত্ত্বিক ভাষায় ‘ওয়ার্কিং পুওর’ বা ‘কর্মজীবী দরিদ্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে একজন ব্যক্তি পূর্ণকালীন কাজ করেও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন।

পোলিস লম্বারদিয়ার এই প্রতিবেদনে যারা শোষণের শিকার হচ্ছেন, তাদের একটি বিশেষ রূপরেখাও তুলে ধরা হয়েছে। দেখা গেছে, এই স্বল্প মজুরির শিকার মূলত নারী, বিদেশি অভিবাসী এবং বয়স্ক ব্যক্তিরা। বিশেষ করে যারা উচ্চতর বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি, তাদের মধ্যেই এই নিম্ন মজুরিতে কাজ করার প্রবণতা বা বাধ্যবাধকতা বেশি। প্রবাসীদের জন্য এটি একটি বিশেষ উদ্বেগের বিষয়, কারণ মিলানের শ্রমবাজারে তাদের একটি বড় অংশ কায়িক শ্রমের সাথে জড়িত।

বেতনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মিলানে স্থায়ী চুক্তিতে (Tempo Indeterminato) কাজ করা সত্ত্বেও অনেকের বার্ষিক আয় ১৫ থেকে ১৬ হাজার ইউরোর নিচে। অন্যদিকে, যারা খণ্ডকালীন বা পার্ট-টাইম কাজ করেন, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়; অনেকের বার্ষিক আয় আট হাজার ইউরোর কোটা স্পর্শ করতে পারছে না। বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি এবং মিলানের আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় এই আয় অত্যন্ত নগণ্য।

গবেষণাটি এই পরিস্থিতির পেছনের মূল কারণগুলোকেও চিহ্নিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে বিভিন্ন সেবামূলক খাতে ‘সর্বনিম্ন দরপত্রের চুক্তি’ বা ‘লো-বিড কন্ট্রাক্ট’ (Appalti al massimo ribasso) এই শোষণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কোম্পানিগুলো কাজ পাওয়ার আশায় যখন সর্বনিম্ন মূল্যে টেন্ডার জমা দেয়, তখন তার চূড়ান্ত কোপ পড়ে সাধারণ শ্রমিকের বেতনের ওপর। যে খাতগুলোতে এই ধরণের শোষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে রয়েছে নির্মাণ শিল্প (Edilizia), লজিস্টিক বা মালামাল ব্যবস্থাপনা খাত, পরিচ্ছন্নতা কর্মী (Cleaning services), কেয়ারগিভার বা সেবা কাজ এবং নিরাপত্তা কর্মীর (Security) পেশা।

পোলিস লম্বারদিয়া সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, মিলানের তথাকথিত সমৃদ্ধি এবং আকর্ষণীয় জীবনযাত্রার সুফল সবাই সমানভাবে পাচ্ছে না। বরং এই বৈশ্বিক সচ্ছলতা টিকে আছে ভ্যালু চেইন বা মূল্য কাঠামোর একদম নিচে থাকা প্রান্তিক শ্রমিকদের চরম ত্যাগের বিনিময়ে। এই ধরণের তীব্র শ্রম শোষণ শুধু যে কয়েক লাখ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে তা নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে ইতালির সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের উত্তরণে চুক্তিবদ্ধ কাজগুলোর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনা এবং শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। বিশেষ করে প্রবাসীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, সমৃদ্ধ মিলানের আড়ালে এই ‘আধুনিক দাসত্ব’ বা নিম্ন মজুরির প্রথা আরও গেড়ে বসতে পারে।

মিলানে প্রতি ৫ জনে ১ জন শ্রমিক কম বেতনে কাজ করছেন।
প্রায় ২ লাখ শ্রমিকের মধ্যে নারী, প্রবাসী ও নির্মাণ-লজিস্টিক খাতের কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

Polis Lombardia-এর “Focus sui lavoratori poveri nell’area metropolitana di Milano” গবেষণা প্রতিবেদন।

TAGGED:
Share This Article