রোম, ২১ এপ্রিল ২০২৬ – ইতালির সিনেটে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিলের আইনসভা প্রক্রিয়া। বিলটির পূর্ণ নাম: “অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সংক্রান্ত বিধান এবং ২০২৪ সালের ১৪ মে তারিখের ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন ও আশ্রয়বিষয়ক চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বিধান”। এই বিলটি গত ১১ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়।
এই বিলের মাধ্যমে ইইউর একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিবাসন নির্দেশিকা (ডিরেক্টিভ) এবং সাতটি পৃথক বিধিমালা (রেগুলেশন) ইতালির জাতীয় আইনে একীভূত করার পথ প্রশস্ত হবে। পাশাপাশি অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক সুরক্ষাসংক্রান্ত বেশ কিছু অতিরিক্ত বিধানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিলের কাঠামো: দুটি অধ্যায়, সতেরোটি ধারা
বিলটি মোট দুটি প্রধান অধ্যায়ে বিভক্ত, যার প্রতিটি ধারা একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে।
প্রথম অধ্যায়: অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সংক্রান্ত বিধান
এই অধ্যায়টিতে মোট সাতটি ধারা রয়েছে, যেগুলি অভিবাসীদের আটকাদেশ থেকে শুরু করে অপ্রাপ্তবয়স্ক বিদেশি শিশুদের সুরক্ষা পর্যন্ত বিস্তৃত বিষয় নিয়ে সংস্কার প্রস্তাব করেছে।
ধারা ১ — বিদেশি নাগরিকের আটকাদেশ সংক্রান্ত বিধান: এই ধারায় ইতালিতে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের হেফাজতে রাখার পদ্ধতি ও শর্তাবলী নিয়ে নতুন আইনি কাঠামো নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ধারা ২ — সমুদ্রসীমায় অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা: জননিরাপত্তা বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি বিদ্যমান থাকলে সামুদ্রিক সীমান্তের আঞ্চলিক জলসীমা অতিক্রমে অস্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান এই ধারায় স্থান পেয়েছে।
ধারা ৩ — বিচারকের আদেশে বিতাড়ন বা অপসারণ: আদালতের রায়ের ভিত্তিতে বিদেশি নাগরিকদের বিতাড়ন বা দেশ থেকে অপসারণের প্রক্রিয়া সংক্রান্ত নতুন বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে এই ধারায়।
ধারা ৪ — বিদেশি কারাবন্দিদের বিতাড়ন প্রক্রিয়া: কারারুদ্ধ বিদেশি নাগরিকদের বিতাড়নের জন্য নজরদারি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে পরিচালিত আইনি প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বিধান এই ধারায় উল্লেখিত হয়েছে।
“অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সংক্রান্ত বিধান এবং ২০২৪ সালের ১৪ মে তারিখের ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন ও আশ্রয়বিষয়ক চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বিধান”।
এই বিলটি গত ১১ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়।

ধারা ৫ — অসঙ্গী বিদেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং পড়াশোনার উদ্দেশ্যে নাবালকদের প্রবেশ ও অবস্থান: পরিবার বা অভিভাবকবিহীন বিদেশি শিশু-কিশোরদের সুরক্ষা এবং বিদেশি নাবালকদের পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ইতালিতে প্রবেশ ও বসবাসের নিয়মাবলি এই ধারায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
ধারা ৬ — আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সংক্রান্ত বিধান: আন্তর্জাতিক আশ্রয় ও সুরক্ষা প্রার্থনাকারীদের বিষয়ে নতুন আইনি বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে এই ধারায়।
ধারা ৭ — বিশেষ আদালত বিভাগ গঠন: ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা ডিক্রি-আইন (নং ১৩/২০১৭, পরবর্তীতে আইন নং ৪৬/২০১৭-এ রূপান্তরিত)-এর তৃতীয় অনুচ্ছেদের অধীনে থাকা বিচারাধীন মামলাগুলির নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বিচারিক বিভাগ (সেকশন স্ত্রালচো) গঠনের বিধান রয়েছে এই ধারায়।
দ্বিতীয় অধ্যায়: ইইউ অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তি বাস্তবায়নের বিধান
এই অধ্যায়ে মোট দশটি ধারা রয়েছে, যেগুলো সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ইতালির জাতীয় আইনে কার্যকর করার ক্ষমতা ও নীতিমালা নির্ধারণ করে।
ধারা ৮ — সরকারকে প্রদত্ত আইনপ্রণয়নের ক্ষমতা: ইইউ অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারকে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা (delega) অর্পণ করা হয়েছে এই ধারায়।
ধারা ৯ — আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন নির্দেশিকা: ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও কাউন্সিলের ২০২৪/১৩৪৬ নম্বর নির্দেশিকা (১৪ মে ২০২৪)-এর আলোকে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা প্রার্থনাকারীদের আবাসন-সংক্রান্ত জাতীয় আইন প্রণয়নের নীতি ও মানদণ্ড নির্ধারিত হয়েছে এই ধারায়।
ধারা ১০ — আন্তর্জাতিক সুরক্ষার মর্যাদা নির্ধারণ: ২০২৪/১৩৪৭ নম্বর ইইউ বিধিমালার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৃতীয় দেশের নাগরিক বা রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষার যোগ্যতা, শরণার্থী বা সাহায্যমূলক সুরক্ষা প্রদানের একক মর্যাদা এবং স্বীকৃত সুরক্ষার বিষয়বস্তু সংক্রান্ত নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিধিমালাটি ২০০৩/১০৯/ইসি নির্দেশিকা সংশোধন করে এবং ২০১১/৯৫/ইইউ নির্দেশিকা বাতিল করে।
ধারা ১১ — অভিন্ন আশ্রয় পদ্ধতি: ২০২৪/১৩৪৮ নম্বর বিধিমালার সাথে সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জুড়ে একটি অভিন্ন আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার নীতি ও মানদণ্ড নির্ধারিত হয়েছে এই ধারায়। এই বিধিমালা পুরনো ২০১৩/৩২/ইইউ নির্দেশিকা বাতিল করে দেয়।
ধারা ১২ — আশ্রয় ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনা: ২০২৪/১৩৫১ নম্বর ইইউ বিধিমালার আলোকে আশ্রয় ও অভিবাসনের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় আইনি কাঠামো নির্মাণের নীতি ও মানদণ্ড রয়েছে এই ধারায়। এই বিধিমালাটি ২০২১/১১৪৭ ও ২০২১/১০৬০ বিধিমালা সংশোধন করে এবং পুরনো ডাবলিন বিধিমালা (ইইউ নং ৬০৪/২০১৩) বাতিল করে।
ধারা ১৩ — সংকট ও অপ্রতিরোধ্য পরিস্থিতিতে করণীয়: অভিবাসন ও আশ্রয় ক্ষেত্রে সংকট পরিস্থিতি এবং অপ্রতিরোধ্য পরিস্থিতিতে (force majeure) করণীয় নির্ধারণকারী ২০২৪/১৩৫৯ নম্বর ইইউ বিধিমালার সাথে সামঞ্জস্য বিধানের নীতি ও মানদণ্ড নির্ধারিত হয়েছে এই ধারায়।
ধারা ১৪ — বাহ্যিক সীমান্ত যাচাই, ইউরোডেক ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণ: তিনটি ইইউ বিধিমালার সাথে সামঞ্জস্য বিধানের নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে এই ধারায়: (ক) ২০২৪/১৩৪৯ — বাহ্যিক সীমান্তে যাচাই প্রক্রিয়া, (খ) ২০২৪/১৩৫৬ — ইউরোডেক তথ্যভাণ্ডারের নিয়মাবলি এবং (গ) ২০২৪/১৩৫৮ — একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ কার্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
ধারা ১৫ — অভিবাসন আইনের হালনাগাদ ও পুনর্বিন্যাস: বিদ্যমান অভিবাসন আইনকানুন আধুনিক প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে হালনাগাদ ও সংশোধনের জন্য নীতি ও মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে এই ধারায়।
ধারা ১৬ — একত্রিত আইনসংকলন প্রস্তুতি: অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক সুরক্ষাসংক্রান্ত সমস্ত বিধিমালা সংকলিত ও সুশৃঙ্খলভাবে ‘টেস্তি উনিচি’ (একত্রিত আইনসংকলন) আকারে পুনর্গঠনের নীতি ও মানদণ্ড উল্লেখ করা হয়েছে এই ধারায়।
ধারা ১৭ — আর্থিক বিধান: এই আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক বিধানাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে শেষ এই ধারায়।
পটভূমি ও গুরুত্ব
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তি’ (Migration and Asylum Pact) ২০২৪ সালের মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছিল। এটি ইইউর সদস্যভুক্ত সব দেশের জন্য একটি অভিন্ন এবং সমন্বিত অভিবাসন নীতির কাঠামো তৈরি করে। এই চুক্তির আওতায় প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রকে তাদের জাতীয় আইনকে ইইউর নতুন বিধিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
ইতালির এই বিলটি সেই বাধ্যবাধকতার বাস্তব প্রতিফলন। বর্তমানে বিলটি সিনেটে তার আইনি যাত্রা শুরু করেছে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এটি আইনে পরিণত হলে ইতালির অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

