লিবিয়া উপকূলে উদ্ধার হওয়া ৫০ জন অভিবাসীকে নিয়ে তোসকানার বন্দরে পৌঁছেছে জার্মান উদ্ধারকারী জাহাজ সী-ওয়াচ ৫; উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ১২ জন অভিভাবকহীন শিশু রয়েছে।
ভূমধ্যসাগরের উত্তাল পথ পাড়ি দিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে আসা আরও ৫০ জন অভিবাসীকে নিয়ে ইতালির তোসকানা (Tuscany) অঞ্চলের মেরিনা দি কারারা (Marina di Carrara) বন্দরে ভিড়েছে জার্মান এনজিও পরিচালিত উদ্ধারকারী জাহাজ ‘সী-ওয়াচ ৫’ (Sea-Watch 5)। রোববার সকালে জাহাজটি বন্দরে নোঙর করার পর স্থানীয় প্রশাসন ও মানবিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
ইতালীয় সংবাদমাধ্যম আনসা (ANSA)-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জলসীমায় লিবিয়া উপকূল থেকে এই অভিবাসীদের উদ্ধার করেছিল সী-ওয়াচ কর্তৃপক্ষ। উদ্ধারকৃত ৫০ জনের এই দলটিতে ১২ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক রয়েছে, যাদের সাথে কোনো অভিভাবক নেই (Unaccompanied minors)। এই শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন স্থানীয় সমাজসেবা বিভাগের কাছে একটি বড় অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেরিনা দি কারারা বন্দরে অভিবাসীবাহী জাহাজ আসার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এটি ছিল উক্ত বন্দরে অভিবাসীদের একাদশতম (১১তম) অবতরণ। গত কয়েক বছরে এই বন্দরটি অভিবাসীদের জন্য অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত এই বন্দরে প্রায় ১,৬০০ জন অভিবাসী পদার্পণ করেছেন, যাদের প্রত্যেককেই প্রাথমিক মানবিক সহায়তা ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

জাহাজটি বন্দরে পৌঁছানোর আগেই তোসকানা অঞ্চলের সিভিল প্রোটেকশন (Civil Protection), রেড ক্রস (Red Cross) এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ (USL) তাদের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছিল। জাহাজ থেকে অভিবাসীদের নামার পরপরই শুরু হয় প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা। বিশেষ করে দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার ধকল এবং কোনো সংক্রামক ব্যাধি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখেন চিকিৎসকরা। মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে তাদের খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রয়োজনীয় বস্ত্র সরবরাহ করা হয়।
ইতালীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই ৫০ জন অভিবাসীকে তোসকানা অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদে রাখা হবে না। তাদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাইয়ের কাজ শেষ হওয়ার পর নিকটবর্তী লিগুরিয়া (Liguria) এবং ইতালির অন্যান্য অঞ্চলের অভ্যর্থনা কেন্দ্রগুলোতে (Reception Centers) স্থানান্তরিত করা হবে। বিশেষ করে ১২ জন অভিভাবকহীন শিশুকে সরকারের বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচির অধীনে নির্দিষ্ট আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে, যেখানে তাদের শিক্ষা ও বিকাশের সুযোগ দেওয়া হবে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর অভিবাসীদের স্থানীয় ‘আইএমএম প্যাভিলিয়নে’ (IMM Pavilion) নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মাসা-কারারা (Massa-Carrara) অঞ্চলের প্রিফেকচার (Prefecture) এবং কুয়েস্তুরা বা পুলিশ সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে তাদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং আইনি নথিপত্র তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে অভিবাসীদের আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ এবং প্রাথমিক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে করে তাদের আশ্রয়ের আবেদন প্রক্রিয়াটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করা যায়।
তোসকানা অঞ্চলের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা সবসময়ই অভিবাসন সংকটে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। মেরিনা দি কারারা বন্দরের এই নিয়মিত অবতরণ প্রক্রিয়াটি স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর মধ্যকার সমন্বিত প্রচেষ্টারই একটি অংশ। উদ্ধারকৃতদের সুস্থতা নিশ্চিত করা এবং তাদের পরবর্তী গন্তব্যে পাঠানোর আগ পর্যন্ত যাবতীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এই অভিবাসীদের নিজ নিজ গন্তব্যে সরিয়ে নেওয়ার কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

সী ওয়াচ ৫ জাহাজটি ৫০ জন অভিবাসীকে নিয়ে মারিনা দি কারারা বন্দরে এসে পৌঁছেছে।
ANSA
মেরিনা দি কারারায় ভিড়ল সী-ওয়াচ ৫, এলো ৫০ অভিবাসী
জার্মান এনজিও ‘সি ওয়াচ ৫’-এর জাহাজ ৫০ জন অভিবাসীকে নিয়ে মারিনা দি কারারা (মাসা কারারা) বন্দরে প্রবেশ করেছে।
দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার অভিযানের পর সমুদ্রে বেশ কয়েকদিন ধরে চলা যাত্রাটি শেষ করে জাহাজটি সন্ধ্যা ৭টার কয়েক মিনিট পর ঘাটে ভিড়েছিল।
সামগ্রিকভাবে, আজকের জাহাজটি সহ আপুয়ান বন্দরে নোঙর করা এনজিও জাহাজের সংখ্যা বেড়ে ২৩-এ দাঁড়িয়েছে, যার প্রথমটি আসবে ৩০ জানুয়ারী, ২০২৩-এ। আজ আগত ৫০ জনকে নিয়ে, মেরিনা দি কারারা বন্দরে মোট ২,৪৯৩ জন অভিবাসী অবতরণ করেছেন। এটি চতুর্থবার যখন সি-ওয়াচ ৫ আপুয়ান বন্দরে নোঙর করেছে: এই জার্মান এনজিওটির সর্বশেষ অবতরণ হয়েছিল ২৯ জুন, ২০২৫-এ। অভ্যর্থনা কার্যক্রম মাসা-কারারা প্রিফেকচার দ্বারা সমন্বিত হয়। অবতরণের পর, অভিবাসীদের তাদের নির্ধারিত অভ্যর্থনা কেন্দ্রে পাঠানোর আগে প্রাথমিক চিকিৎসা ও শনাক্তকরণের জন্য নিকটবর্তী ইম-কারারাফিয়েরে প্রদর্শনী কেন্দ্রের প্যাভিলিয়ন সি-তে নিয়ে যাওয়া হবে।
নতুন একীভূত কর্মসংস্থান ওয়ার্ক পারমিট ব্যবস্থা ইতালিতে বিদেশী শ্রমিকদের জন্য একটি বড় পদক্ষেপ যা প্রক্রিয়াটিকে স্বচ্ছ এবং দ্রুততর করবে। এই আইনি কাঠামোটি তৃতীয় দেশের নাগরিকদের তাদের অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট জানাবে এবং নিয়োগকর্তাদের তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করবে। যদিও অনেক বিশেষ ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে এই ওয়ার্ক পারমিট প্রযোজ্য নয়, তবুও এই নতুন ব্যবস্থা ইতালিয় শ্রম বাজারে দক্ষতা এবং ন্যায্যতা বৃদ্ধি করবে।

