আশ্রয়ের আবেদন নাকচ হওয়া অভিবাসীদের দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সকে অভূতপূর্ব ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন; আশ্রয়প্রার্থীদের ইইউ-র বাইরের বিশেষ কেন্দ্রে রেখে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রস্তাব।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের বহিঃসীমানা রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের (Frontex) ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে। ব্রাসেলসের নতুন এই কৌশল অনুযায়ী, অনিয়মিত অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াকে আরও কঠোর ও গতিশীল করতে সংস্থাটিকে বিশেষ আইনি ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব দেওয়া হবে। বিশেষ করে, ইউরোপের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে বিশেষ ‘রিটার্ন হাব’ (Return Hubs) বা প্রত্যাবর্তন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লেয়েন ইইউ সদস্য দেশগুলোর নেতাদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই নতুন অভিবাসন নীতির রূপরেখা তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, বর্তমানের ধীরগতির প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ইউরোপের অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। নতুন এই প্রস্তাবের অধীনে ফ্রন্টেক্স কেবল সীমান্ত পাহারা বা লজিস্টিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং অভিবাসীদের পরিচয় শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে সরাসরি প্রত্যাবাসন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
এই নতুন পরিকল্পনার সবচেয়ে বিতর্কিত ও আলোচিত অংশ হলো ‘রিটার্ন হাব’। এই কেন্দ্রগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমানার বাইরে কোনো তৃতীয় দেশে স্থাপন করা হবে। যেসব অভিবাসীর আশ্রয়ের আবেদন ইউরোপে নাকচ হয়ে গেছে, তাদের সরাসরি নিজ দেশে পাঠানোর আগে সাময়িকভাবে এই হাবগুলোতে রাখা হবে। ইতালি এবং আলবেনিয়ার মধ্যে বর্তমানে বিদ্যমান অভিবাসন চুক্তিটি এই মডেলের প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। ইইউ মনে করছে, এই পদ্ধতিতে অভিবাসীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং দ্রুত বহিষ্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নে বর্তমানে আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ শেষ পর্যন্ত কার্যকরভাবে নিজ দেশে ফিরে যান বা তাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়। এই হারকে সন্তোষজনক পর্যায়ে নিয়ে আসতে একটি নতুন ‘রিটার্ন ডিরেক্টিভ’ বা প্রত্যাবাসন নীতিমালা তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে ইউরোপীয় কমিশন। উল্লেখ্য যে, ২০১৮ সালে একই ধরনের একটি উদ্যোগ নেওয়া হলেও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে তা ভেস্তে গিয়েছিল। তবে বর্তমানে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, জার্মানি এবং ফ্রান্সের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোতে অভিবাসন বিরোধী রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকায় ব্রাসেলস এবার আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে।
ফ্রন্টেক্সের হাতে নতুন যেসব ক্ষমতা দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে অভিবাসীদের ‘ভালনারেবিলিটি’ বা দুর্বলতা যাচাই-বাছাই করার আইনি অধিকার। এর ফলে কারা আশ্রয়ের জন্য যোগ্য এবং কাদের দ্রুত ফেরত পাঠানো হবে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ফ্রন্টেক্সের সরাসরি অংশগ্রহণ থাকবে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই প্রস্তাবের সমালোচনা করে জানিয়েছে যে, ইইউ-র বাইরে অভিবাসীদের প্রক্রিয়াকরণ করলে তাদের মৌলিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ ক্ষুণ্ন হতে পারে।
এই নতুন নীতিমালার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত সেইসব অনিয়মিত অভিবাসীদের ওপর, যাদের আইনি নথিপত্র এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষ করে এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের ক্ষেত্রে পরিচয় শনাক্তকরণ এবং প্রত্যাবাসনের হার অনেক বেড়ে যেতে পারে। ইউরোপীয় কমিশনের এই প্রস্তাবটি আগামী ইইউ সম্মেলনে বিস্তারিত আলোচনার পর চূড়ান্ত আইনি রূপ পেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যকর হলে ইউরোপের অভিবাসন ইতিহাসে এক নতুন ও কঠোর অধ্যায়ের সূচনা হবে।

ফ্রনটেক্সকে আরও ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে, যার মধ্যে ‘রিটার্ন হাব’ বা প্রত্যাবাসন কেন্দ্র পরিচালনার নতুন দায়িত্বও অন্তর্ভুক্ত।
infomigrants
ফ্রন্টেক্সের ক্ষমতা বৃদ্ধি: অভিবাসীদের জন্য তৈরি হচ্ছে ‘রিটার্ন হাব’
জার্মান এনজিও ‘সি ওয়াচ ৫’-এর জাহাজ ৫০ জন অভিবাসীকে নিয়ে মারিনা দি কারারা (মাসা কারারা) বন্দরে প্রবেশ করেছে।
দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার অভিযানের পর সমুদ্রে বেশ কয়েকদিন ধরে চলা যাত্রাটি শেষ করে জাহাজটি সন্ধ্যা ৭টার কয়েক মিনিট পর ঘাটে ভিড়েছিল।
সামগ্রিকভাবে, আজকের জাহাজটি সহ আপুয়ান বন্দরে নোঙর করা এনজিও জাহাজের সংখ্যা বেড়ে ২৩-এ দাঁড়িয়েছে, যার প্রথমটি আসবে ৩০ জানুয়ারী, ২০২৩-এ। আজ আগত ৫০ জনকে নিয়ে, মেরিনা দি কারারা বন্দরে মোট ২,৪৯৩ জন অভিবাসী অবতরণ করেছেন। এটি চতুর্থবার যখন সি-ওয়াচ ৫ আপুয়ান বন্দরে নোঙর করেছে: এই জার্মান এনজিওটির সর্বশেষ অবতরণ হয়েছিল ২৯ জুন, ২০২৫-এ। অভ্যর্থনা কার্যক্রম মাসা-কারারা প্রিফেকচার দ্বারা সমন্বিত হয়। অবতরণের পর, অভিবাসীদের তাদের নির্ধারিত অভ্যর্থনা কেন্দ্রে পাঠানোর আগে প্রাথমিক চিকিৎসা ও শনাক্তকরণের জন্য নিকটবর্তী ইম-কারারাফিয়েরে প্রদর্শনী কেন্দ্রের প্যাভিলিয়ন সি-তে নিয়ে যাওয়া হবে।
নতুন একীভূত কর্মসংস্থান ওয়ার্ক পারমিট ব্যবস্থা ইতালিতে বিদেশী শ্রমিকদের জন্য একটি বড় পদক্ষেপ যা প্রক্রিয়াটিকে স্বচ্ছ এবং দ্রুততর করবে। এই আইনি কাঠামোটি তৃতীয় দেশের নাগরিকদের তাদের অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট জানাবে এবং নিয়োগকর্তাদের তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করবে। যদিও অনেক বিশেষ ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে এই ওয়ার্ক পারমিট প্রযোজ্য নয়, তবুও এই নতুন ব্যবস্থা ইতালিয় শ্রম বাজারে দক্ষতা এবং ন্যায্যতা বৃদ্ধি করবে।

