ভেনিসের লিসিও গ্যালিলি থেকে গণিতে অসামান্য মেধার স্বাক্ষর রেখে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মাজেদ রহমান; মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করলেন বিরল ‘লোদে’ বা বিশেষ প্রশংসা।
ইতালির ভেনিস প্রদেশের দোলো (Dolo) শহরের লিসিও সায়েন্টিফিকো গ্যালিলিও গ্যালিলি (Liceo Scientifico Galileo Galilei) হাই স্কুলে এখন আনন্দের পরিবেশ। সেই আনন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অত্যন্ত মেধাবী এক শিক্ষার্থী- মাজেদ রহমান। ইতালির অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্রীয় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় (Maturità) মাযেদ কেবল শতভাগ নম্বরই পাননি, বরং অর্জন করেছেন বিরল ‘১০০ ও লোদে’ (100 e Lode) বা বিশেষ সম্মানসূচক প্রশংসা।
মাজেদ রহমানের এই অসামান্য সাফল্য কেবল তার পরিবার বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, বরং ইতালিতে বসবাসরত বিশাল বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এক বড় গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতালীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘লোদে’ বা বিশেষ সম্মান অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ, যা কেবল সেইসব শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় যারা প্রতিটি বিষয়ে সর্বোচ্চ দক্ষতা প্রদর্শনের পাশাপাশি সৃজনশীলতায় অনন্য নজির স্থাপন করেন।
গণিত অলিম্পিয়াডে জাতীয় পদক
মাজেদ রহমানের এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম এবং মেধার নিরবচ্ছিন্ন চর্চা। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলের আগেই তিনি ইতালির জাতীয় পর্যায়ে নিজের মেধার জানান দিয়েছিলেন। চেসেনাটিকো (Cesenatico) শহরে অনুষ্ঠিত জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডে তিনি ব্রোঞ্জ পদক জয় করেছিলেন। গণিতের জটিল সব সমস্যার সমাধান এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণে তার পারদর্শিতা তাকে ইতালির উদীয়মান গণিতবিদদের কাতারে নিয়ে এসেছে। তার শিক্ষকরা জানিয়েছেন, ক্লাসে মাজেদ কেবল একজন মনোযোগী ছাত্রই ছিলেন না, বরং যেকোনো কঠিন বিষয়কে সহজভাবে বোঝার ও ব্যাখ্যা করার এক সহজাত ক্ষমতা তার মধ্যে রয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও উচ্চশিক্ষা
মাজেদ রহমানের লক্ষ্য এখন আরও বড়। হাই স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি এবার পা রাখছেন উচ্চশিক্ষার বৃহত্তর আঙিনায়। তিনি ইতালির প্রাচীন ও বিশ্বখ্যাত পাডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে (University of Padua) গণিত বিভাগে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উল্লেখ্য, এই পাডোভা বিশ্ববিদ্যালয় এক সময় বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলির পদচারণায় মুখরিত ছিল। সেই একই বিদ্যাপীঠে গণিত নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করার স্বপ্ন মাজেদকে এখন আরও অনুপ্রাণিত করছে। তার এই যাত্রা আগামী দিনে তাকে একজন দক্ষ বিজ্ঞানী বা গবেষক হিসেবে গড়ে তুলবে বলে তার নিকটজনরা আশাবাদী।
সফল আত্তীকরণ ও সামাজিক গুরুত্ব
মাজেদ রহমানের এই অর্জন ইতালিতে ‘সেকেন্ড জেনারেশন’ বা দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসীদের সফল আত্তীকরণের (Integration) এক উজ্জ্বল উদাহরণ। অভিবাসী পরিবারের সন্তান হয়েও ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিবন্ধকতা জয় করে ইতালীয় সহপাঠীদের পেছনে ফেলে এই শীর্ষস্থান অর্জন করা মোটেও সহজ ছিল না। তার বাবা-মা বহু বছর আগে বাংলাদেশ থেকে ইতালিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন এক বুক স্বপ্ন নিয়ে। আজ মাজেদ সেই স্বপ্নের সফল রূপায়ন করেছেন।
ইতালির স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও মাজেদের এই সাফল্যের খবর গুরুত্বের সাথে প্রচার করেছে। তারা একে ইতালীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য এবং মেধার এক জয়জয়কার হিসেবে বর্ণনা করেছে। লিসিও গ্যালিলি স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং মাযেদের গণিত শিক্ষক তার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, মাজেদ কেবল তার মেধা দিয়েই নয়, বরং তার নম্রতা ও পরিশীলিত আচরণ দিয়েও সবার মন জয় করে নিয়েছেন।
প্রবাসী কমিউনিটির প্রতিক্রিয়া
মাজেদের এই অসামান্য সাফল্যে ইতালির প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। অনেক অভিবাসী অভিভাবক মনে করছেন, মাজেদ রহমানের এই জয় ইতালিতে বড় হওয়া বাংলাদেশি শিশুদের জন্য এক বিরাট অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিবেশ, পরিশ্রম এবং পরিবারের সমর্থন থাকলে বিদেশের মাটিতেও মেধার লড়াইয়ে জয়ী হওয়া সম্ভব।
ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতারা মাজেদ রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, বিদেশের মাটিতে দেশের মুখ উজ্জ্বল করা মাজেদদের মতো তরুণরাই আমাদের আগামী দিনের সম্পদ। তারা মাজেদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করার পাশাপাশি আশা প্রকাশ করেছেন যে, উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি বিশ্বজুড়ে মেধার স্বাক্ষর রাখবেন এবং মানবতার কল্যাণে কাজ করবেন।
মাজেদ রহমানের এই অগ্রযাত্রা কেবল একটি পরীক্ষার ফল নয়, বরং এটি একটি সংগ্রামের গল্প, যা সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর অদম্য ইচ্ছার প্রতিফলন। ইতালির পাডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় গণিতের নতুন নতুন রহস্য উন্মোচনে মাজেদ রহমান এগিয়ে যাবেন- এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
বাংলাদেশ থেকে সম্মানের পথে: গণিত চ্যাম্পিয়ন মাজিদের গল্প। “মনোনিবেশ করার জন্য আমার প্রথম অনুপ্রেরণা এসেছিল আমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে।”
ilgazzettino

