ইতালির কুনিওতে অভিবাসীদের আবাসন ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত: চালু হলো ‘লারিস’ প্রকল্প

4 Min Read

জরুরি অভ্যর্থনা কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসা অভিবাসীদের স্থায়ী আবাসন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তুলতে ইতালির কুনিও প্রদেশে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা প্রায় ৩৫০ জন বিদেশিকে সরাসরি সহায়তা করবে।

ইতালির পিয়েমন্তে অঞ্চলের কুনিও (Cuneo) প্রদেশে বসবাসরত অভিবাসীদের জন্য জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও তাদের স্থানীয় সমাজে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ‘লারিস’ (Laris) নামক একটি বিশেষ প্রকল্প জোরদার করা হয়েছে। অভিবাসীদের কেবল জরুরি সহায়তা প্রদান নয়, বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদী কর্মসংস্থান ও আবাসনের নিশ্চয়তা দেওয়াই এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য। মূলত যারা সরকারি অভ্যর্থনা কেন্দ্রগুলোর (CAS বা SAI) সহায়তা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন, তাদের জন্য এই উদ্যোগটি একটি ‘সেতু’ হিসেবে কাজ করবে।

প্রকল্পের লক্ষ্য ও সুবিধাভোগী
‘লারিস’ শব্দটির পূর্ণরূপ হলো ‘স্বায়ত্তশাসন, বাসস্থান এবং সামাজিক একীভূতকরণের ল্যাবরেটরি’ (Laboratorio per l’Autonomia, la Residenza e l’Integrazione Sociale)। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩৫০ জন অভিবাসীকে সরাসরি সহায়তা প্রদান করা হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘আসাইলাম, মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইন্টিগ্রেশন ফান্ড’ (FAMI)-এর অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পে প্রায় ১৩ লাখ ইউরো বরাদ্দ করা হয়েছে। কুনিও প্রদেশের প্রিফেকচার, স্থানীয় পৌরসভা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়নের সমন্বয়ে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

কর্মসংস্থান ও আইনি সহায়তা
প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অভিবাসীদের শ্রমবাজারে প্রবেশের পথ সুগম করা। ইতালির অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিআইএল (CGIL) এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে। অনেক অভিবাসী কাজ জানা থাকা সত্ত্বেও আইনি জটিলতা বা ভাষাগত দক্ষতার অভাবে ভালো কাজ পান না। লারিস প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের পেশাদার প্রশিক্ষণ, সিভি তৈরি এবং সরাসরি নিয়োগকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হবে। এছাড়া রেসিডেন্স পারমিট বা ইতালিতে বসবাসের অনুমতি সংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিরসনেও বিশেষ ডেস্কের মাধ্যমে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

আবাসন সংকটের সমাধান
ইতালিতে অভিবাসীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি উপযুক্ত ঘর খুঁজে পাওয়া। অনেক সময় বর্ণবাদ বা কাগজপত্রের অভাবের কারণে বাড়িওয়ালারা বিদেশিদের কাছে ঘর ভাড়া দিতে চান না। এই সমস্যা মোকাবিলায় লারিস প্রকল্প একটি বিশেষ ‘হাউসিং এজেন্সি’ হিসেবে কাজ করছে। এটি একদিকে যেমন অভিবাসীদের ঘর খুঁজে দিচ্ছে, অন্যদিকে বাড়িওয়ালাদেরও নিশ্চয়তা প্রদান করছে যাতে তারা নিশ্চিন্তে অভিবাসীদের কাছে ঘর ভাড়া দেন। কুনিও অঞ্চলের আলবা, ব্রো এবং মন্ডোভি শহরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেও এই কার্যক্রম বিস্তৃত করা হয়েছে।

কর্মকর্তাদের বক্তব্য
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিবাসীদের কেবল খাদ্য বা বস্ত্র দিয়ে সাহায্য করা যথেষ্ঠ নয়। তাদের যদি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া না হয়, তবে তারা অপরাধ বা অনিয়মিত কাজের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। সিজিআইএল কুনিও-এর প্রতিনিধি পিয়েরা রোমানো জানান, “আমরা চাই অভিবাসীরা যেন সমাজের বোঝা না হয়ে সম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠে। কুনিও প্রদেশের কৃষি ও শিল্প খাতে প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন, আর এই প্রজেক্ট সেই চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখবে।”

বাংলাদেশি ও বিদেশি শ্রমিকদের ওপর প্রভাব
কুনিও এবং এর আশপাশের অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি এবং দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী বসবাস করেন। এদের মধ্যে অনেকে কৃষি খামার বা শিল্প কারখানায় কাজ করেন। লারিস প্রকল্পের এই উদ্যোগ বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্যও অত্যন্ত ইতিবাচক। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে সঠিক আবাসনের অভাবে ভুগছেন বা যারা চুক্তিভিত্তিক কাজের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চান, তারা এই প্রকল্পের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারবেন।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ইতালির অন্যান্য প্রদেশগুলোর জন্য কুনিও-র এই ‘লারিস’ প্রকল্প একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই উদ্যোগ সফল হয়, তবে তা সমগ্র ইতালিতে ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে। এর ফলে দেশটিতে অনিয়মিত অভিবাসনের হার কমবে এবং স্থানীয় অর্থনীতির চাকা আরও সচল হবে। প্রকল্পটির মেয়াদ আগামী কয়েক বছর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যার সাফল্য নির্ভর করবে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতার ওপর।

শিল্প ও তৃতীয় খাত চুক্তি: লারিস প্রকল্পের মাধ্যমে অভিবাসীরা চাকরি ও বাসস্থান খুঁজে পায়।

torino.repubblica.it

১৮ মাস আগে শুরু হওয়া এই উদ্যোগটি তুরিন এবং গ্রান্ডা অঞ্চলে সরবরাহ ও চাহিদার অসামঞ্জস্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছে এবং এর প্রথম ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে।

TAGGED:
Share This Article