মাদ্রিদের এই পদক্ষেপকে ‘জনতুষ্টিমূলক’ আখ্যা দিয়ে রোম জানিয়েছে, এর ফলে ইতালিতে অভিবাসন চাপ বাড়ার পাশাপাশি ইউরোপীয় সংহতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।\
ইউরোপের দুই প্রভাবশালী দেশ ইতালি ও স্পেনের মধ্যে অভিবাসন ইস্যু নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। স্পেনের পেদ্রো সানচেজ সরকার কর্তৃক কয়েক লাখ অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধ করার বিশেষ উদ্যোগের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছেন ইতালির উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি। তিনি মনে করছেন, স্পেনের এই অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের প্রভাব দেশটির সীমান্ত ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে, বিশেষ করে ইতালিতে পড়তে পারে।
স্পেনের প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘এল মুন্দো’-কে (El Mundo) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তাজানি এই কর্মসূচিকে ‘ডেমাজজিক’ বা জনতুষ্টিমূলক বলে বর্ণনা করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা কোনো একক দেশের ব্যক্তিগত বিষয় হতে পারে না। তাজানির আশঙ্কার মূল কারণ হলো ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক নৈকট্য। তিনি যুক্তি দেন যে, স্পেনে বৈধতা পাওয়া অভিবাসীরা পরবর্তীতে খুব সহজেই ইতালিতে চলে আসার চেষ্টা করতে পারেন, কারণ দুই দেশের মধ্যে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অনেক মিল রয়েছে।
ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা ফর্নেসিনা (Farnesina) প্রধানের উদ্বেগের মূল জায়গাটি হলো এই প্রক্রিয়ার ব্যাপকতা। ২০২৬ সালে স্পেন সরকার দেশটিতে অনিয়মিতভাবে বসবাসরত প্রায় ৫ লাখ (৫০০,০০০) বিদেশি নাগরিককে আইনি মর্যাদা দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। যদিও স্পেনের রাজনৈতিক মহলে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। তাজানি অভিযোগ করেন যে, এমন একটি সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্তের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্য সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা বা সমন্বয় করা হয়নি। এমনকি ইতালিকেও আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

মাদ্রিদ প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যারা ১ জানুয়ারি ২০২৬-এর আগে স্পেনে প্রবেশ করেছেন এবং আবেদনের সময় অন্তত পাঁচ মাস সেখানে অবস্থান করছেন, তারা এই সুযোগ পাবেন। শর্ত হিসেবে আবেদনকারীর কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড থাকা চলবে না এবং তাকে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে গণ্য হওয়া যাবে না। স্পেন সরকারের দাবি, এই উদ্যোগের ফলে অবৈধ শ্রমবাজার থেকে অভিবাসীদের মুক্ত করা সম্ভব হবে এবং তারা কর প্রদানের মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন। একই সঙ্গে এটি অভিবাসীদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
তবে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্পেনের রেসিডেন্স পারমিট বা বসবাসের অনুমতি পাওয়া মানেই কিন্তু ইতালিতে কাজ করার স্বয়ংক্রিয় অধিকার পাওয়া নয়। শেনজেন (Schengen) এলাকার নিয়ম অনুযায়ী, স্পেনের পারমিটধারী একজন নন-ইইউ নাগরিক অন্য দেশে ১৮০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯০ দিন শুধুমাত্র পর্যটক হিসেবে থাকতে পারেন। ইতালিতে দীর্ঘমেয়াদী বসবাস বা বৈধভাবে কাজ করতে হলে তাকে অবশ্যই ইতালীয় জাতীয় আইন ও ভিসা নীতি অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু তাজানি মনে করেন, সাময়িক চলাচলের এই সুযোগকেও অনেকে ইতালিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে থেকে যাওয়ার কাজে ব্যবহার করতে পারেন।
দুই দেশের সরকারের মধ্যে আদর্শগত ভিন্নতাও এই বিতর্কের একটি বড় কারণ। ইতালির বর্তমান ডানপন্থী জোট সরকার অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে বিশ্বাসী, অন্যদিকে স্পেনের প্রগতিশীল সরকার অভিবাসীদের মূলধারায় আনার পক্ষপাতী। অবশ্য তাজানি পরিষ্কার করেছেন যে, এই মতভেদ সত্ত্বেও স্পেন ও ইতালির দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কে কোনো চির ধরবে না।
এই বিতর্ক মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতির একটি গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে কিছু দেশ মনে করে যে, দেশে অবস্থানরত অভিবাসীদের বৈধতা দিলে শ্রমের চাহিদা পূরণ হয় এবং শোষণ বন্ধ হয়। অন্যদিকে, অনেক রাষ্ট্র মনে করে বড় আকারের বৈধকরণ কর্মসূচি অভিবাসীদের জন্য একটি ‘পুল ফ্যাক্টর’ বা আকর্ষক হিসেবে কাজ করে, যা শেষ পর্যন্ত পুরো ইউরোপের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। স্পেনের এই পদক্ষেপ নিয়ে রোমের প্রতিবাদ আগামীতে ইইউ-এর সামগ্রিক অভিবাসন নীতি নির্ধারণে নতুন কোনো বিতর্কের সূত্রপাত করবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
স্পেনে অভিবাসীদের ব্যাপক বৈধকরণ ইতালিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি; তার মতে, এমন সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর সমন্বয়েই নেওয়া উচিত।
stranieriinitalia


