ইতালির ল্যাম্পেডুসায় ৮৮ অভিবাসীর বিপজ্জনক পদার্পণ: উদ্ধারকৃতদের মধ্যে বড় অংশই বাংলাদেশি নাগরিক

4 Min Read

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে তিনটি পৃথক নৌকায় আসা এসব অভিবাসীদের উদ্ধার করেছে ইতালীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী ও ফনটেক্স; বর্তমানে তাদের ল্যাম্পেডুসার অস্থায়ী ক্যাম্পে রাখা হয়েছে।

ইতালির ল্যাম্পেডুসা দ্বীপে গত কয়েক ঘণ্টায় নতুন করে তিনটি নৌকা থেকে মোট ৮৮ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে। ভূমধ্যসাগরীয় এই দ্বীপটি আবারও অভিবাসনের উত্তাল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত রক্ষা সংস্থা ফনটেক্স (Frontex) এবং ইতালীয় আর্থিক পুলিশ বা গুয়ার্দিয়া দি ফিনাঞ্জা (Guardia di Finanza)-র টহল বোটগুলো যৌথভাবে এই উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে।

উদ্ধারকৃত এই ৮৮ জনের মধ্যে একটি বড় অংশই দক্ষিণ এশীয় দেশ বাংলাদেশের নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রথম যে নৌকাটি উদ্ধার করা হয়, সেটি ছিল আয়তনে বেশ বড় এবং তাতে মোট ৭০ জন আরোহী ছিলেন। এই দলটিতে ৯ জন নারী এবং ৬ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু রয়েছে। এই আরোহীরা মূলত বাংলাদেশ, মিশর, পাকিস্তান এবং সিরিয়ার নাগরিক। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তারা সকলেই লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি (Tripoli) থেকে একটি নড়বড়ে নৌকায় করে ইউরোপের উদ্দেশ্যে তাদের বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা শুরু করেছিলেন।

এরপর আরও একটি অভিযানে দ্বিতীয় নৌকাটি থেকে ১০ জনকে উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে ২ জন নারী ছিলেন। এই ক্ষুদ্র দলটিতে আফগানিস্তান, মরক্কো এবং সুদানের নাগরিকরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এই নৌকাটিও লিবিয়ার ত্রিপোলি উপকূল থেকে ল্যাম্পেডুসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। সবশেষে তৃতীয় একটি ছোট নৌকা থেকে আরও ৮ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়, যারা সকলেই তিউনিসীয় নাগরিক। তারা তিউনিসিয়ার মাহদিয়া (Mahdia) নামক উপকূলীয় শহর থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে আধ্যাত্মিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রকল্পটির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন বোলোনিয়ার ইনস্টিটিউট অব রিলিজিয়াস সায়েন্সেস-এর পরিচালক ও ধর্মতত্ত্ববিদ ডন পাওলো রেনার। তিনি ইতালীয় বার্তা সংস্থা আনসা-কে (ANSA) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “খ্রিস্টীয় আদর্শ আমাদের শেখায় অন্যকে সম্মান করতে এবং অন্যের প্রয়োজনে সহমর্মী হতে। সালোর্নোর মতো একটি বহু-জাতিগত সম্প্রদায়ে যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে, সেখানে তুচ্ছ বিতর্ক দিয়ে এই পরিবেশ নষ্ট করা উচিত নয়।”

উল্লেখ্য যে, আল্টো আদিজে অঞ্চলে মুসলিম নারীদের জন্য সুইমিং পুলে পৃথক সময় বরাদ্দের বিতর্কটি নতুন নয়। এর আগে ২০০৯ সালেও বলজানো শহরে তৎকালীন মেয়র লুইগি স্প্যাগনোলি একই ধরনের একটি প্রস্তাব করেছিলেন, যা প্রবল জনরোষ ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের মুখে বাতিল হয়ে যায়। মূলত ইতালির বেরগামো শহর থেকে এই ধারণার উৎপত্তি হয়েছিল, যেখানে স্থানীয় গির্জা বা ডায়োসিস মুসলিম নারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে সাঁতার শেখার জন্য বিশেষ সময়ের দাবি জানিয়েছিল।

ইতালিতে এই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক চললেও ইউরোপের অন্যান্য শহর যেমন ভিয়েনা বা মিউনিখে এই প্রথা দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে সফলভাবে চলছে। সেখানে সরকারি পুলগুলোতে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা হয় শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণে নয়, বরং যারা শারীরিক প্রতিবন্ধী, স্থূলতার কারণে হীনম্মন্যতায় ভোগেন কিংবা অতীতে কোনো সহিংসতার শিকার হয়েছেন—তাদের মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করার জন্য।

প্রতিবেদনের শেষ দিকে এসে ইতালীয় গণমাধ্যমগুলো বর্তমানের এই ‘বুরকিনি’ বিতর্কের সাথে ২০২৪ সালের একটি অদ্ভুত ফ্যাশন ট্রেন্ডের তুলনা করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইতালীয় তরুণদের মধ্যে সাঁতারের শর্টসের নিচে সুতির অন্তর্বাস পরে পুলে নামার একটি প্রবণতা দেখা গেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিচ্ছন্নতার প্রশ্নে এর বিরোধিতা করলেও অনেক ক্ষেত্রে তা নীরবে মেনে নেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে যে, যেখানে অস্বাস্থ্যকর ফ্যাশন ট্রেন্ড সহ্য করা হচ্ছে, সেখানে ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের প্রয়োজনে বিশেষ পোশাক নিয়ে কেন এই অসম বিতর্ক। আপাতত সালোর্নোর এই উদ্যোগ সোমবার থেকে শুরু হলেও এর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ওপর নির্ভর করছে।

লাম্পেদুসায় তিনটি নৌকায় করে আরও ৮৮ অভিবাসী পৌঁছেছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি, মিশরীয়, পাকিস্তানি ও সিরীয় নাগরিক রয়েছেন; একজন অসুস্থ তিউনিসিয়ানকে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।

agrigentonotizie

TAGGED:
Share This Article