স্পেনের সিউটা সংকটের প্রেক্ষাপটে ‘আলবেনিয়া মডেল’ অনুসরণ করে আফ্রিকার মাটিতে নতুন অভিবাসী কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দিচ্ছে মেলোনি সরকার; ইউরোপীয় অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পে জার্মানি সমর্থন দিলেও তীব্র বিরোধিতায় নেমেছে ফ্রান্স ও স্পেন।
ইতালির বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট সরকার অনিয়মিত অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমানার বাইরে বিশেষ ‘প্রত্যাবাসন হাব’ (Repatriation Hub) স্থাপনের পরিকল্পনা নতুন করে শুরু করেছে। সম্প্রতি স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সিউটাতে (Ceuta) বড় ধরনের অভিবাসী সংকটের পর রোম এই প্রস্তাবটি জোরালোভাবে সামনে এনেছে। মূলত আলবেনিয়ার সাথে ইতালির করা বিতর্কিত অভিবাসন চুক্তির আদলেই এখন আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশে কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার। তবে এবারের বিশেষত্ব হলো, এই কেন্দ্রগুলো সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থায়িত করার দাবি জানানো হয়েছে।
ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা ভিমিনালে (Viminale) এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পালাজ্জো কিজি (Palazzo Chigi) সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় একটি বিশেষ জরুরি বৈঠকে এই প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হবে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈঠকে ইতিমধ্যে জার্মানি সহ ইউরোপের আরও ২১টি দেশ সমর্থন জানিয়ে চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, ফ্রান্স এবং স্পেন এই জোট থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে। মূলত গত ১২ জুন থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিধিমালার ওপর ভিত্তি করেই এই কেন্দ্রগুলো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে রোম, যা অনেকটা ইতালি-আলবেনিয়া চুক্তির আইনি কাঠামো অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে।
ইতালির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই ইস্যুটি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ফ্রাতেলি দ’ইতালিয়া (Fratelli d’Italia)-র শীর্ষ নেতা কার্লো ফিদাঞ্জা দাবি করেছেন, অভিবাসন নীতিতে বর্তমানে জর্জিয়া মেলোনি পুরো ইউরোপকে পথ দেখাচ্ছেন। তিনি বিরোধীদের কড়া সমালোচনা করে বলেন, শেঞ্জেন (Schengen) চুক্তি স্থগিত করা নিয়ে বামপন্থীরা শোরগোল তুললেও, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ যখন সীমান্তে অনিয়মিত অভিবাসীদের ফেরত পাঠিয়েছিলেন, তখন তারা চুপ ছিলেন। ফিদাঞ্জার মতে, ফ্রান্স ও স্পেনের এই প্রস্তাব থেকে দূরে থাকা আসলে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজকে ইউরোপীয় রাজনীতিতে একঘরে করে ফেলেছে।

অন্যদিকে, ইতালির উপ-প্রধানমন্ত্রী ও লেগা (Lega) দলের নেতা মাত্তেও সালভিনি একে ‘সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, দেশের সীমান্ত রক্ষা করা কোনো রাজনৈতিক প্রচার বা প্রোপাগান্ডা নয়, বরং এটি সরকারের দায়িত্ব। অভিবাসন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ক্ষমতাসীন জোট সাধারণ মানুষের সমর্থন পেতে মরিয়া, বিশেষ করে যখন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ডানপন্থী ভোট ব্যাংক নিয়ে নানা সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ফোরজা ইতালিয়া (Forza Italia)-র পক্ষ থেকেও স্পেনের নমনীয় অভিবাসন নীতির কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে।
বিরোধী শিবির অবশ্য সরকারের এই পরিকল্পনাকে চরম অমানবিক ও অকার্যকর বলে মনে করছে। ফাইভ স্টার মুভমেন্টের নেতা জুসেপ্পে কন্তে মেলোনির এই সিদ্ধান্তকে ‘জাতীয় লজ্জা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। কন্তে অভিযোগ করেছেন যে, সরকার কেবল জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে এই ধরণের বিতর্কিত প্রস্তাব আনছে। পাশাপাশি তিনি ইউক্রেন ইস্যুতেও সরকারের সমালোচনা করে জানিয়েছেন যে, তারা কিয়েভকে আরও সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিপক্ষে। এছাড়া ইতালি ভিভা (Italia Viva)-র নেতা মাত্তেও রেনজি শেঞ্জেন চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্তকে ‘অদূরদর্শী’ এবং ‘অর্থহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির (PD) নেতারাও দাবি করেছেন যে, এই ধরণের প্রোপাগান্ডা কেবল দেশের ক্ষতিই করবে।
আগামী মঙ্গলবারের বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ানতেদোসি যখন ব্রাসেলসে এই প্রস্তাব পেশ করবেন, তখন ইউরোপের অভিবাসন নীতির ভবিষ্যৎ কোন দিকে যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আফ্রিকা মহাদেশের কোন কোন দেশ এই কেন্দ্রগুলো স্থাপনের জন্য ইতালির সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে রাজি হবে—তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে মেলোনি সরকার আশা করছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ দেশের সমর্থন নিয়ে তারা এই ‘আফ্রিকা মডেল’ বাস্তবায়ন করতে পারবে, যা ইতালিতে বসবাসরত বিদেশি বা প্রবাসী এবং নতুন করে আসা অভিবাসীদের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
ইতালি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে আফ্রিকায় নতুন অভিবাসী প্রত্যাবাসন কেন্দ্র গড়ার প্রস্তাব আনছে। অনিয়মিত অভিবাসীদের দ্রুত ফেরাতে বিষয়টি আগামী ইউরোপীয় শীর্ষ বৈঠকে উত্থাপন করা হবে।
corriere


