ডাবলিন চুক্তি অনুযায়ী জার্মানি থেকে অভিবাসীদের ফিরিয়ে নিতে আর্থিক সহায়তার শর্ত দিয়েছে ইতালি। অন্যদিকে, জার্মান পতাকাবাহী এনজিও জাহাজগুলোর উদ্ধার তৎপরতা বন্ধ না করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মাত্তেও সালভিনি।
ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসীদের ভাগাভাগি এবং তাদের ফেরত পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে ইতালি ও জার্মানির মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন এখন চরম দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) নিয়ম অনুযায়ী, ইতালিতে প্রথম প্রবেশ করা অভিবাসীদের জার্মানি থেকে রোমে ফেরত পাঠানোর প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনার সৃষ্টি। ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসি (Matteo Piantedosi) জার্মান কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন যে, জার্মানি থেকে অভিবাসীদের ফেরত নিতে হলে বার্লিনকে প্রয়োজনীয় তহবিল বা আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে।
পিয়ান্তেদোসি ও সালভিনি’র দ্বিমুখী চাপ
ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিয়ান্তেদোসি তার জার্মান সমকক্ষ আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ডটের (Alexander Dobrindt) সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। পিয়ান্তেদোসি চাইছেন, যেসব অভিবাসীকে জার্মানি ফেরত পাঠাতে চায়, তাদের দেখভালের জন্য জার্মানি যেন আর্থিক অনুদান দেয়। তবে বার্লিন এখন পর্যন্ত এমন কোনো আর্থিক প্রতিশ্রুতিতে রাজি হয়নি।
এই আলোচনার মধ্যেই ইতালির উপ-প্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি (Matteo Salvini) আরও কঠোর ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জার্মানিকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন, যদি জার্মানি অভিবাসী ফেরত নেওয়ার বিষয়ে সহযোগিতা না করে, তবে ইতালি সেই সব অভিবাসীদের ভরণপোষণের জন্য জার্মানির কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করবে যারা সমুদ্র থেকে জার্মান পতাকাবাহী এনজিও জাহাজগুলোর মাধ্যমে উদ্ধার হয়ে ইতালিতে এসেছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, কোনো জাহাজ যে দেশের পতাকাবাহী (Flag state), সেই দেশই ওই জাহাজের আরোহীদের জন্য চূড়ান্তভাবে দায়বদ্ধ। সালভিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, জার্মান এনজিওগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ না করা হলে ইতালি ভবিষ্যতে এই জাহাজগুলোকে তাদের বন্দরে নিরাপদ আশ্রয় (Safe harbor) দিতে অস্বীকার করতে পারে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের লঙ্ঘন হবে এবং এর ফলে ইতালিকে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে।
জার্মান এনজিও ও অভিবাসনের পরিসংখ্যান
ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি (Giorgia Meloni) ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত জার্মান এনজিওগুলো ভূমধ্যসাগর থেকে প্রায় ২২,৫০০ অভিবাসীকে উদ্ধার করে ইতালির বন্দরে নামিয়েছে। এই সংখ্যাটি ব্যক্তিগত উদ্ধারকারী জাহাজগুলোর মাধ্যমে আসা মোট অভিবাসীর অর্ধেকেরও বেশি। ইউএনএইচসিআর (UNHCR) এর তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে ইতালিতে সমুদ্রপথে মোট ৩ লাখ ১৯ হাজার অভিবাসী এসেছেন। সেই হিসেবে জার্মান এনজিওগুলোর মাধ্যমে আসা অভিবাসীর হার মাত্র ৭ শতাংশ। তবে ইতালি সরকারের দাবি, এই ব্যক্তিগত উদ্ধারকারী জাহাজগুলোর উপস্থিতি অভিবাসীদের বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা করতে উৎসাহিত করছে, যার ফলে প্রতি বছর শত শত মানুষের মৃত্যু ঘটছে।

ডাবলিন-৩ রেগুলেশন ও নতুন অভিবাসন চুক্তি
এই সংকটের মূলে রয়েছে ‘ডাবলিন-৩’ (Dublin III) রেগুলেশন। এই আইন অনুযায়ী, একজন অভিবাসী ইউরোপীয় ইউনিয়নে যে দেশে প্রথম প্রবেশ করবেন, সেখানেই তার আশ্রয়ের আবেদন যাচাই করার কথা। সাধারণত জার্মানি এই আইনের দোহাই দিয়ে অভিবাসীদের ইতালিতে ফেরত পাঠাতে চায়। তবে ইতালি সরকারের ব্যাখ্যা ভিন্ন। গত ১২ জুন থেকে ইইউ-এর নতুন ‘অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তি’ (Pact on Migration and Asylum) কার্যকর হওয়ার পর ইতালি বলছে, আগের ডাবলিন মামলাগুলো এখন তামাদি হয়ে গেছে।
ইতালির মতে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী এখন ‘সংহতি ব্যবস্থা’ (Solidarity Mechanism) কার্যকর হওয়ার কথা। এর আওতায় অভিবাসীদের চাপে থাকা দেশগুলো অন্য সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে হয় সরাসরি অভিবাসী স্থানান্তর অথবা আর্থিক সহায়তা পাওয়ার অধিকারী। পিয়ান্তেদোসি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নতুন আইন কার্যকর হওয়ার আগের মামলাগুলো নিয়ে ইতালি কেবল তখনই সহযোগিতা করবে যদি জার্মানি আর্থিক অনুদান দেয়।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও মেলোনির পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী মেলোনি বারবার ইইউ-এর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন যাতে অভিবাসীদের আশ্রয় সংক্রান্ত প্রাথমিক প্রক্রিয়াগুলো ইউরোপের বাইরের কোনো দেশে সম্পন্ন করা যায়। এর মাধ্যমে তিনি অভিবাসীদের সুরক্ষা নীতি কিছুটা শিথিল করে দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে চান।
বর্তমানে রোম ও বার্লিনের মধ্যে এই অচলাবস্থা কেবল দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন ব্যবস্থাপনাকেও এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ইতালিতে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ এই রাজনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে। যদি জার্মানি ইতালির শর্তে রাজি না হয় এবং ইতালি অভিবাসী ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে হাজার হাজার মানুষের আইনি অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এই কূটনৈতিক লড়াই আগামী দিনে আরও বড় কোনো সংকটের জন্ম দেয় কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ইতালির চাপ: জার্মানিকে ডাবলিন নিয়মে অভিবাসীদের ফেরত নিতে সহযোগিতার জন্য চাপ দিচ্ছে রোম; একইসঙ্গে জার্মান উদ্ধারকারী এনজিওগুলোর কার্যক্রম নিয়েও কঠোর পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছে।
infomigrants


