ইতালির ভেনিস ও মেস্ত্রে এলাকায় প্রস্তাবিত একটি বিশাল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। মেয়রের আপত্তির জেরে ক্ষুব্ধ প্রবাসীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, দাবি না মানলে তারা ধর্মঘটের মাধ্যমে ভেনিস ও মেস্ত্রের পর্যটন খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল অচল করে দেবেন।
ইতালির ভেনিস প্রদেশের মেস্ত্রেতে (Mestre) একটি আধুনিক ও বড় মসজিদ নির্মাণের অনুমতি না দিলে পুরো শহর অচল করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি। সম্প্রতি ইতালীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইল গাজোতিনো’ (Il Gazzettino)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কমিউনিটির নেতারা এই কঠোর অবস্থানের কথা জানান। ভেনিসের ডেপুটি মেয়র সিমন ভেনচুরিনি (Simone Venturini) ওই মসজিদ প্রকল্পের বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করার পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
মেয়রের আপত্তি ও একীভূতকরণের শর্ত
মেস্ত্রে শহরের ভিয়া জুস্তিজিয়া (via Giustizia) এলাকায় প্রায় ১৫০০ মুসুল্লি ধারণক্ষমতার একটি বিশাল মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ‘জোবানি পের লুমানিতা’ (Giovani per l’umanità) নামক একটি বাংলাদেশি সংগঠন। ২০ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ের এই প্রকল্পটির জন্য তারা ইতোমধ্যেই জমি ক্রয় করেছে। তবে মেয়র সিমন ভেনচুরিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, মেস্ত্রেতে এই মুহূর্তে এত বড় কোনো ধর্মীয় স্থাপনার প্রয়োজন নেই।
মেয়রের মতে, বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য মসজিদ নির্মাণের আগে ‘সামাজিক একীভূতকরণ’ বা ইন্টিগ্রেশন বেশি জরুরি। তিনি অভিযোগ করেন যে, স্থানীয় বাংলাদেশিরা এখনো ইতালীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে পুরোপুরি মিশতে পারেননি। বিশেষ করে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা, নারীদের সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের অভাব, ভাষা না জানা এবং বাংলাদেশি মালিকানাধীন দোকানগুলোর অব্যবস্থাপনাকে তিনি প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মেয়র স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যতক্ষণ না এই বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে, ততক্ষণ পৌর কর্তৃপক্ষ মসজিদ নির্মাণের জন্য কোনো আইনি বা নগর পরিকল্পনা সংক্রান্ত অনুমতি (Urban Variance) দেবে না।
কমিউনিটির প্রতিক্রিয়া ও ধর্মঘটের হুমকি
মেয়রের এই ‘আউট-আউট’ বা সরাসরি প্রত্যাখ্যানের পর ২০ হাজার সদস্যের বিশাল বাংলাদেশি কমিউনিটি বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। তারা বলছেন, ব্রুগনারো প্রশাসনের সময় থেকেই তারা নিয়ম মেনে ও মিউনিসিপ্যালিটির নির্দেশিত এলাকাতেই এই জমি কিনেছেন। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার পর যখন তারা নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন নতুন করে শর্ত জুড়ে দেওয়াকে তারা অন্যায় মনে করছেন।

কমিউনিটির মুখপাত্ররা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “যদি আমাদের ধর্মীয় অধিকার এবং মসজিদ নির্মাণের অনুমতি না দেওয়া হয়, তবে আমরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হব। আমরা ধর্মঘট ডাকলে ভেনিস, মেস্ত্রে ও মারঘেরার (Marghera) জনজীবন স্থবির হয়ে যাবে।” তারা আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ভেনিসের পর্যটন খাতের হোটেল-রেস্টুরেন্ট এবং বিখ্যাত জাহাজ নির্মাণ কারখানা ফিনকানতিয়েরি (Fincantieri)-তে কর্মরত শ্রমশক্তির বড় একটি অংশই বাংলাদেশি। তারা কাজ বন্ধ করে দিলে পর্যটন ও শিল্প উৎপাদন উভয়ই মুখ থুবড়ে পড়বে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
ভেনিস ও এর আশপাশের এলাকায় বাংলাদেশিরা কেবল অভিবাসী নন, তারা স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বিশেষ করে ফিনকানতিয়েরি শিপইয়ার্ডে কয়েক হাজার বাংলাদেশি কঠোর পরিশ্রম করেন। এছাড়া ভেনিসের বিশ্ববিখ্যাত পর্যটন শিল্পে রান্নাঘর থেকে শুরু করে হোটেলের বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী কর্মীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্রবাসীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মেয়রের শর্তগুলো কেবল সময়ক্ষেপণের কৌশল। তাদের মতে, নাগরিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ধর্মীয় উপাসনালয় পাওয়ার অধিকারও আধুনিক গণতন্ত্রের অংশ।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
বর্তমানে বিষয়টি একটি বড় ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে। জমির মালিকানা থাকলেও সেখানে স্থাপনা নির্মাণের জন্য নগর পরিকল্পনা পরিবর্তনের অনুমতি একমাত্র মিউনিসিপ্যালিটিই দিতে পারে। ভেনচুরিনি ও তার প্রশাসন তাদের অবস্থানে অনড় থাকলে পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা। অন্যদিকে, বাংলাদেশি কমিউনিটি তাদের দাবি আদায়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশ এবং কর্মবিরতির প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভেনিসের মতো একটি পর্যটন প্রধান শহরে এই অচলাবস্থা তৈরি হলে তা স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মেস্ট্রেতে প্রস্তাবিত ১,৫০০ আসনের মসজিদ নির্মাণে অনুমতি না মিললে ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছে ভেনিসের বাংলাদেশি সম্প্রদায়; প্রকল্পটি নিয়ে পৌরসভার সঙ্গে বিরোধ তীব্র হচ্ছে।
rainews


