ইতালীয় প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড গড়েছে জর্জিয়া মেলোনির সরকার। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অভিবাসন কমার দাবি করলেও কাঠামোগত সংস্কারের অভাব এবং কট্টর ডানপন্থী নতুন জোটের উত্থান আগামী নির্বাচনের জন্য মেলোনির মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
ইউরোপের রাজনীতিতে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ইতালির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সরকারের রেকর্ড গড়েছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট। গত ৮০ বছরে যেখানে ৬৮টি সরকার দেখেছে ইতালি, সেখানে মেলোনি প্রশাসন আজ শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক মাইলফলক উদযাপন করছে। দক্ষিণ ইতালির বারি (Bari) বন্দরে আয়োজিত এই মেগা ইভেন্টে মন্ত্রিসভার শীর্ষ মন্ত্রীরা অংশ নিচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উদযাপনের মাধ্যমেই মূলত ২০২৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের দীর্ঘ প্রচারণার অনানুষ্ঠানিক সূচনা করল বর্তমান সরকার।
ইতালির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি সরকারের মেয়াদ পূর্ণ করা বা দীর্ঘদিন টিকে থাকা নিজেই একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। গতকাল ৩ সেপ্টেম্বর মেলোনি সরকারের ক্ষমতায় থাকার ১,৪১৩ দিন পূর্ণ হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ২০০৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বেরলুসকোনির দ্বিতীয় সরকারের গড়া রেকর্ডটি একদিনের ব্যবধানে ভেঙে গেছে। ইতালীয় ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট ‘পাজেল্লা পোলিতিকা’ (Pagella Politica) অবশ্য জানিয়েছে যে, বেরলুসকোনি ১,৪০৯ দিন পূর্ণ ক্ষমতায় এবং তিন দিন পদত্যাগকারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই হিসাবে মেলোনি আগেই এই রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২২ সালের পর থেকে যখন ইতালিতে মেলোনি শক্ত হাতে দেশ চালাচ্ছেন, ঠিক সেই একই সময়ে প্রতিবেশী ফ্রান্সে পাঁচজন এবং যুক্তরাজ্যে চারজন প্রধানমন্ত্রী বদল হয়েছেন।
এই রেকর্ড উপলক্ষে মেলোনির দল ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ (Fratelli d’Italia) ২৮ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ইতালীয় সংবাদসংস্থা আডনক্রোনোস (Adnkronos)-এর বরাত দিয়ে জানা যায়, ওই নথিতে অর্থনীতি, পরিবার কল্যাণ, স্বাস্থ্যসেবা, অপরাধ দমন এবং জ্বালানি খাতে সরকারের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে। ২০২২ সালে নিজেকে ‘আন্ডারডগ’ বা সুবিধাবঞ্চিত হিসেবে উপস্থাপন করা মেলোনি এখন দাবি করছেন যে তিনি সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছেন। তাঁর সরকারের দাবি— দেশে এখন কর্মসংস্থানে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে এবং বন্ডের স্প্রেড (Spread) ২২০ থেকে কমে প্রায় ৮০ পয়েন্টে নেমেছে। এছাড়া ঘাটতি ও জিডিপির অনুপাত ৮ শতাংশ থেকে কমে ৩ শতাংশের কাছাকাছি আসায় ইতালি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থেকে প্রায় মুক্ত হওয়ার পথে রয়েছে।

বিদেশি ও অভিবাসীদের জন্য সরকারের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী পদক্ষেপ ছিল অভিবাসন ও নিরাপত্তা নীতি। সরকার এই ইস্যুটিকে তাদের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সমুদ্রপথে অনিয়মিত অভিবাসীদের আগমন ২০২৩ সালের ১,৫৭,৬৫১ জন থেকে উল্লেখযোগ্য হারে কমে গত বছর ৬৬,৩১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া নতুন ডিক্রি জারির মাধ্যমে বেশ কিছু নতুন অপরাধের ধারাও সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছে।
তবে এতসব সাফল্যের দাবির আড়ালেও কিছু ব্যর্থতা স্পষ্ট। রাজনৈতিক মিত্রদের সন্তুষ্ট রাখতে গিয়ে সরকার কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে সাহসিকতার পরিচয় দিতে পারেনি বলে সমালোচনা রয়েছে। জনপ্রশাসন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার ঝুলে আছে এবং বিচার বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিচার বিভাগীয় গণভোটে পরাজয় এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন মেলোনি সরকারের ‘অজেয়’ ভাবমূর্তিতে চিড় ধরিয়েছে।
এছাড়া আগামী দিনগুলোতে মেলোনির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারেন কট্টর ডানপন্থী নেতা ও সাবেক জেনারেল রবের্তো ভান্নাচ্চি। তাঁর নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক দল দাবি করছে যে, বর্তমান সরকার অভিবাসন ও নিরাপত্তা ইস্যুতে যথেষ্ট কঠোর নয়। মেলোনির দল এবং তাদের জোটসঙ্গী ‘লেগা’ (Lega) প্রকাশ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, ২০২৭ সালের শেষার্ধে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে ভান্নাচ্চির দল বর্তমান জোটের ভোটব্যাংকে বড় ধরনের ভাগ বসাতে পারে।
দীর্ঘায়ুর রেকর্ড গড়ার পর মেলোনি সরকার এখন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী মাঠে নামছে। ইতালির ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সরকার টিকিয়ে রাখতে প্রধানমন্ত্রীকে রাজনৈতিকভাবে ঠিক কতটা আপস করতে হয়েছে, তা হয়তো আগামী নির্বাচনের ব্যালট বাক্সেই প্রমাণিত হবে।
জর্জিয়া মেলোনির সরকার ১,৪১৩ দিন পেরিয়ে ইতালির প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সরকার হয়েছে; অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতায় সাফল্য থাকলেও কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত সংস্কার অনেকটাই অসম্পূর্ণ।
it.euronews


