আদালত কর্তৃক অভিযুক্তকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘নজিরবিহীন’ আখ্যা দিয়ে আপিল করেছে সরকারি প্রসিকিউটর কার্যালয়; জঘন্য এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সমর্থনে পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি।
ইতালির তুরিন (Torino) শহরে নিজের মিনিমার্কেটে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে যৌন হেনস্থার দায়ে অভিযুক্ত এক ব্যক্তির ‘বিশেষ সুরক্ষা’ (Protezione Speciale) সুবিধা বাতিল করার ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসি (Matteo Piantedosi)। ৪২ বছর বয়সী ওই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পর আদালতের নির্দেশে মুক্তি দেওয়ার ঘটনাটি দেশটিতে ব্যাপক ক্ষোভ ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। সরকারি প্রসিকিউটর অফিস আদালতের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে আপিল করেছে। এদিকে, জঘন্য এই অপরাধের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এবং ভুক্তভোগী কিশোরীটির প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন জানাতে রাস্তায় নেমে এসেছেন স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশীরা।
ইতালির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল রাইত্রে (Raitre)-এর ‘আগোরো’ (Agorà) নামক টকশোতে অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসি আদালতের ওই আদেশের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এভাবে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত ‘নজিরবিহীন ও সংগতিহীন’। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Viminale) বর্তমানে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রমের অগ্রগতির ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি আইনি ফাঁকফোকর গলে আশানুরূপ বিচারিক শাস্তি থেকে পার পেয়েও যান, তবে সরকার তার বিরুদ্ধে অন্যান্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রাখবে। বিশেষ করে, পূর্বে আদালত কর্তৃক তাকে দেওয়া ‘বিশেষ সুরক্ষা’ সুবিধাটি বাতিলের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইতালীয় আইনি পরিভাষায় ‘বিশেষ সুরক্ষা’ বা ‘প্রোতাজিওনে স্পেশালে’ হলো এমন একটি মানবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যার আওতায় কোনো বিদেশী নাগরিককে তার নিজ দেশে ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ করা হয়। সাধারণ রাজনৈতিক আশ্রয় বা রিফিউজি স্ট্যাটাস পাওয়ার শর্ত পূরণ করতে না পারলেও যদি কোনো ব্যক্তিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠালে তার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন, নিপীড়ন, শারীরিক নির্যাতন অথবা অমানবিক আচরণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তাকে ইতালিতে বসবাসের জন্য এই বিশেষ আইনি সুবিধা দেওয়া হয়।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ ওই ৪২ বছর বয়সী দোকানমালিককে কিশোরী হেনস্থার অপরাধে গ্রেফতার করেছিল। প্রাথমিক তদন্তকারী বিচারক বা জিপ (GIP) অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা ও পর্যাপ্ত প্রমাণ খুঁজে পেলেও তার গ্রেফতারি পরোয়ানা বহাল রাখেননি। বিচারকের যুক্তি ছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তির দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা বা প্রবণতা নেই। তাই তাকে কারাগারে রাখার বদলে নিয়মিত পুলিশ স্টেশনে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ (Obbligo di firma) দিয়ে সাময়িকভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই আদেশে ক্ষুব্ধ হয়ে তুরিনের সরকারি প্রসিকিউটর কার্যালয় অবিলম্বে রিভিউ কোর্ট বা আপিল আদালত (Tribunale del Riesame)-এ বিচারকের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে।
অন্যদিকে, জঘন্য এই সামাজিক অপরাধের কারণে পুরো প্রবাসী সমাজের ওপর যেন কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে লক্ষ্যে মাঠে নেমেছে তুরিনের বাংলাদেশি কমিউনিটি। ঘটনার পরপরই তাঁরা একত্রিত হয়ে তুরিন সিটি কর্পোরেশন বা মিউনিসিপ্যালিটি (Comune) ভবনের সামনে একটি সংহতি সমাবেশের আয়োজন করেন। প্রবাসীরা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে নারী ও শিশুর ওপর সকল প্রকার সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ জানান।
সমাবেশে বাংলাদেশি কমিউনিটির একজন প্রতিনিধি বলেন, “আমরা এই দেশের আইনকে সম্মান করি। যে ব্যক্তি এই অপরাধ করেছে, তার মাত্র দুই দিনের জেল হওয়া চরম অন্যায়। আমরা এই ন্যাক্কারজনক কাজের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। তবে একজন অপরাধীর কারণে আমাদের পুরো শান্তিপ্রিয় সমাজকে একই পাল্লায় মাপবেন না। আমরা সবাই অপরাধী নই। আমরা ভুক্তভোগী মেয়েটির পাশে আছি।”
সমাবেশের একপর্যায়ে বাংলাদেশিদের একটি প্রতিনিধি দল তুরিনের নিরাপত্তা বিষয়ক কাউন্সিলর মার্কো পরসেদ্দা (Marco Porcedda)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে। তাঁরা স্থানীয় মিনিমার্কেটগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিশেষ করে রাতে দোকান বন্ধের সময়সীমা এগিয়ে এনে কঠোর নিয়ম জারি করার দাবি জানান। কাউন্সিলর পরসেদ্দা প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই দায়িত্বশীল ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তবে তিনি জানান, ব্যবসার সময়সীমা নির্ধারণের আইনি একচ্ছত্র অধিকার স্থানীয় প্রশাসনের নেই। তবুও প্রবাসীদের দাবির গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি জাতীয় আইন সংশোধন করার জন্য ইতালির কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।
তুরিনে ১৩ বছরের কিশোরীকে হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির ‘বিশেষ সুরক্ষা’ বাতিলের সম্ভাবনা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইনি পদক্ষেপ পর্যালোচনা করছে।
torino.corriere


