আইনি দীর্ঘসূত্রতা এবং থাকার জায়গার অভাবে উত্তর-পূর্ব ইতালির বন্দর নগরী ত্রিয়েস্তে আটকা পড়েছেন বিপুল সংখ্যক অভিবাসী; যাদের বড় একটি অংশই বাংলাদেশি তরুণ। মানবেতর পরিবেশে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা এসব মানুষের স্থানান্তর প্রক্রিয়া স্থগিত থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
ইতালির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত শহর ত্রিয়েস্তের (Trieste) পুরানো বন্দর এলাকা বা পোর্তো ভেকিও (Porto Vecchio) এখন শত শত অভিবাসীর সাময়িক ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। এদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশই বাংলাদেশি তরুণ, যাদের বয়স ২০ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। উন্নত জীবনের আশায় সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছালেও, বর্তমানে তাদের দিন কাটছে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। পোর্তো ভেকিওর খোলা চত্বরে আশ্রয় নেওয়া এসব তরুণের কেউ দুই সপ্তাহ আগে এসেছেন, আবার কেউ কয়েক মাস ধরে অপেক্ষা করছেন পুলিশের প্রাথমিক সাক্ষাৎকারের জন্য।
আইনি জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা
ত্রিয়েস্তের পুলিশ সদর দপ্তর বা কুয়েস্তুরায় (Questura) রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করার জন্য প্রয়োজনীয় অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে দীর্ঘ সময় লাগছে। অনেক অভিবাসী জানিয়েছেন, আগস্টের শেষে বা সেপ্টেম্বরের আগে তাদের সাক্ষাৎকারের কোনো তারিখ মেলেনি। এমনকি অনেকের এখনো আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্টও নেওয়া হয়নি।
ত্রিয়েস্তের পুলিশ কমিশনার বা কুয়েস্তোরে (Questore) লিলিয়া ফ্রেদেলা এই পরিস্থিতি সম্পর্কে জানান, গত মে মাস থেকে একটি পরিকল্পিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছে যাতে পুলিশ দপ্তরের সামনে অভিবাসীদের দীর্ঘ লাইন এড়ানো যায়। তিনি দাবি করেন, প্রতিদিন অন্তত ১৫ জনের আবেদন প্রক্রিয়া করা হচ্ছে এবং নারী ও শিশুদের মতো নাজুক বা ফ্রাজিল (fragile) ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, আবেদনের এই ধীরগতির ফলে সাধারণ অভিবাসীদের অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
আবাসন সংকট ও মানবেতর পরিবেশ
ত্রিয়েস্তের এই সংকটের পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে গত জুন মাস থেকে শুরু হওয়া একটি সরকারি সিদ্ধান্ত। আগে ত্রিয়েস্তে পৌঁছানো অভিবাসীদের ইতালির অন্যান্য অঞ্চলে স্থানান্তর করা হতো। কিন্তু জুন থেকে এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া স্থগিত করায় শহরটিতে অভিবাসীদের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। আশ্রয়ের জন্য কোনো নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় শত শত মানুষ এখন খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

এসব মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ‘কাসা দঙ্ক’ (Casa Donc) নামক একটি চিকিৎসা কেন্দ্রের চিকিৎসকরা বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছেন। চিকিৎসকদের মতে, শীতকালে এসব অভিবাসীকে ‘বোরা’ (Bora) নামক প্রচণ্ড ঠান্ডা বাতাসের মোকাবিলা করতে হয়, আর এখন গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে তারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের শিকার হচ্ছেন।
তদন্তে উঠে এসেছে যে, নোংরা পরিবেশে বসবাসের কারণে অভিবাসীরা মশা, মাছি এবং ছারপোকার কামড়ে অতিষ্ঠ। এমনকি অনেক অভিবাসী ইঁদুরের কামড় খেয়ে চিকিৎসার জন্য আসছেন বলেও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। কাসা দঙ্ক গত দুই বছরে প্রায় ১০,০০০ অভিবাসীকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছে।
রাজনৈতিক হাতিয়ার বনাম মানবিক বাস্তবতা
চিকিৎসক ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, অভিবাসন এখন একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। জনসমর্থন বাড়াতে বা রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য অভিবাসন সমস্যাকে বড় করে দেখালেও, এর পেছনে থাকা মানুষগুলোর—বিশেষ করে নারী, শিশু এবং তরুণদের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে।
তবে এতো প্রতিকূলতার মাঝেও বাংলাদেশি ও অন্যান্য অভিবাসীদের মধ্যে এক অদ্ভুত সহনশীলতা লক্ষ্য করেছেন চিকিৎসকরা। তাঁরা অবাক হয়ে দেখছেন যে, এতো নোংরা পরিবেশে থেকেও অভিবাসীরা নিজেদের এবং পোশাক-পরিচ্ছদ অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন রাখছেন। স্থানীয় দাতব্য সংস্থা ‘সান মার্তিনো আল ক্যাম্পো’ (San Martino al campo)-র সহযোগিতায় তারা নিয়মিত গোসল ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। চিকিৎসকরা মনে করেন, ধর্মীয় অনুশাসন এবং ব্যক্তিগত সচেতনতাই তাদের এই চরম সংকটেও পরিচ্ছন্ন থাকতে সাহায্য করছে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
ত্রিয়েস্তের এই মানবিক বিপর্যয় কাটাতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে সমন্বয় জরুরি হয়ে পড়েছে। স্থানান্তর প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু না হলে এবং আইনি আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা না নিলে শহরটির পরিবেশ ও অভিবাসীদের নিরাপত্তা আরও হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আপাতত পোর্তো ভেকিওর খোলা আকাশের নিচে বাংলাদেশি এই তরুণদের জন্য প্রতিটি রাতই হয়ে দাঁড়িয়েছে টিকে থাকার এক নতুন যুদ্ধ।
ত্রিয়েস্তেতে শত শত অভিবাসী আশ্রয় আবেদন অপেক্ষায় রাস্তায় থাকছেন। জুন থেকে অন্য অঞ্চলে স্থানান্তর বন্ধ থাকায় আবাসনের সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
rainews


