সারদিনিয়া দ্বীপের ওলবিয়া শহরে রেস্তোরাঁ মালিকের স্ত্রীকে জিম্মি করার পর সাহসিকতার সাথে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করলেন বাংলাদেশি কর্মী রায়হান ও তাঁর সহযোগীরা।
ইতালির সারদিনিয়া (Sardinia) দ্বীপের ওলবিয়া (Olbia) শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি এশিয়ান রেস্টুরেন্টে এক ভয়াবহ ডাকাতি ও জিম্মি করার ঘটনা ঘটেছে। রেস্তোরাঁ মালিকের স্ত্রীকে ধারালো ছুরির মুখে জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টার সময় নিজের জীবন বাজি রেখে তা প্রতিহত করেছেন সেখানে কর্মরত কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি। এই বীরত্বপূর্ণ উদ্ধার অভিযানের সময় হামলাকারীর এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে ৪ জন গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে রায়হান নামের এক বাংলাদেশি যুবক রয়েছেন। অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করার পর তাঁকে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে (বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী পরদিন রাত ২টা ৩০ মিনিট) ওলবিয়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‘ইচি এশিয়ান ফিউশন’ (Ichi Asian Fusion) নামক রেস্তোরাঁয় এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ঘটনার ঠিক আগে আলজেরীয় বংশোদ্ভূত এক ব্যক্তি প্রথমে পাশের একটি বাংলাদেশি মালিকানাধীন পিৎজা ও কাবাবের দোকানে হন্যে হয়ে প্রবেশ করে। সেখানে পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় সে দ্রুত ‘ইচি এশিয়ান ফিউশন’ রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়ে। দোকানে প্রবেশ করেই সে চিৎকার করে বাঁচানোর আকুতি জানাতে থাকে এবং দাবি করে যে কয়েকজন মানুষ তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাড়া করছে।
রেস্তোরাঁর মালিকের স্ত্রী এলেনা (Elena) তাকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য রান্নাঘরে (Cucina) যেতে বলেন এবং নিজে পুলিশে খবর দেওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু সাহায্য চাওয়ার ভান করা ওই ব্যক্তি মুহূর্তের মধ্যেই তার রূপ পরিবর্তন করে। পকেট থেকে ধারালো ছুরি বের করে সে এলেনার গলায় ধরে এবং ক্যাশ থেকে সমস্ত টাকা দাবি করে। প্রায় দুই থেকে তিন মিনিট ধরে সে এলেনাকে জিম্মি করে রাখে এবং হুমকি দেয় যে কেউ সামনে এগিয়ে আসলে তাকে হত্যা করা হবে। উপস্থিত লোকজনের মতে, ওই হামলাকারী মারাত্মকভাবে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিল।

সেদিন শুক্রবার থাকায় বাংলাদেশি কর্মী রায়হানের সাপ্তাহিক ছুটি ছিল। তিনি রেস্তোরাঁর বাইরে থেকে বিষয়টি লক্ষ্য করেন। ওই সময় তিনি স্থানীয় একটি মসজিদের দিকে যাচ্ছিলেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে দ্রুত রেস্তোরাঁর ভেতরে প্রবেশ করেন। রায়হান জানান, শুরুতে জিম্মি এলেনার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাঁরা কেউ সামনে এগোননি। তবে দুই-তিন মিনিট পর যখন হামলাকারী কিছুটা অসতর্ক হয়ে পেছনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, ঠিক তখনই রায়হান, সিয়াম মোল্লা এবং সালমানসহ কয়েকজন মিলে এলেনাকে উদ্ধারের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন।
উদ্ধার অভিযানের একপর্যায়ে হামলাকারী ক্ষিপ্ত হয়ে রায়হানের শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে মারাত্মক জখম করে। তবে রক্তাক্ত অবস্থাতেও রায়হান অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ডাকাতের হাত থেকে ছুরিটি কেড়ে নিতে সক্ষম হন। এই ধস্তাধস্তির সময় রায়হান ছাড়াও আরও তিনজন আহত হন, যারা যথাক্রমে নাইজেরীয়, ইতালীয় এবং ব্রাজিলীয় নাগরিক। তাঁদের শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। পরবর্তীতে উপস্থিত অন্যান্য কর্মী ও সাধারণ মানুষ মিলে হামলাকারীকে গণধোলাই দিয়ে আটকে রাখে এবং ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছালে তাকে তাদের হাতে তুলে দেয়।
ঘটনার পরপরই আহত চারজনকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে ওলবিয়ার ‘জিওভান্নি পাওলো ২য়’ হাসপাতালে (Giovanni Paolo II Hospital) নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁদের এক রাত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। পরদিন ৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁদের ছাড়পত্র দেয় এবং বাসায় ফেরার অনুমতি দেয়। তবে তাঁদের শারীরিক ক্ষত বিবেচনা করে চিকিৎসকেরা তাঁদের অন্তত ১৪ দিনের সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ইতালির স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত শুরু করেছে এবং আটককৃত আলজেরীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশি রায়হানসহ চারজন আহত হন ইতালির সারদিনিয়ার ওলবিয়া শহরের একটি রেস্তোরাঁয় ছুরিকাঘাতের ঘটনায়; হামলার পর অভিযুক্তকে আটক করে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
npbnews


